সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

রাকিবের জিপিএ-৫ পাওয়ার খবরে আনন্দের বদলে পরিবারে শোক

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন ছিল ১৮ বছরের রাকিবের; ১৬ লাখ টাকা মুক্তিপণ চেয়েও চার লাখ টাকা নেওয়ার পর হত্যা করা হয় তাকে

এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে টাঙ্গাইলের গোপালপুরের রাকিবুল ইসলাম রাকিব। ছেলের এমন সাফল্যে যে বাড়িতে আনন্দের বন্যা বইয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে এখন স্বজনদের আহাজারি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখা রাকিবকে অপহরণের পর মুক্তিপণ দিয়েও ফেরত পাননি তার বাবা-মা। নিখোঁজের ২০ দিন পর নীলফামারীর ডিমলায় মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় তার বস্তাবন্দি মরদেহ।

শনিবার এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর রাকিবের বাবা খাদেমুল ইসলাম বলেন, ছেলের জিপিএ-৫ পাওয়ার খবরে তাঁদের অনেক আনন্দিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছেলের সাফল্যের আনন্দটুকুও উপভোগ করতে পারছেন না তাঁরা।

তিনি বলেন, “ছেলে জিপিএ-৫ পেয়েছে, এ খবরে আমাদের অনেক আনন্দ হওয়ার কথা ছিল। স্বপ্ন ছিল ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, বড় হবে। কিন্তু ছেলের এই সাফল্যের আনন্দটুকুও উপভোগ করতে পারলাম না।”

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন ছিল রাকিবের

রাকিবুল ইসলাম রাকিবের বয়স হয়েছিল ১৮ বছর। তার বাড়ি গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদীর আটা গ্রামে। তার বাবা খাদেমুল ইসলাম পেশায় একজন কৃষক।

রাকিব ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করা। সেই লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিতে ঢাকার ফার্মগেট এলাকার একটি কোচিং সেন্টারেও ভর্তি হয়েছিল সে।

পরিবারের আশা ছিল, পড়াশোনা শেষ করে একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে রাকিব। তার সাফল্যে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই অপহরণ ও হত্যার শিকার হয় সে।

অপহরণ করে ১৬ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি

রাকিবের পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় সে। পরে অপরিচিত এক যুবক তার বাবা খাদেমুল ইসলামের হোয়াটসঅ্যাপে রাকিবের চোখ-মুখ বাঁধা ও নির্যাতনের ছবি পাঠায়। এরপর তার মুক্তির জন্য ১৬ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে রাকিবকে হত্যা করার হুমকিও দেওয়া হয়।

ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় দরিদ্র কৃষক খাদেমুল ইসলাম ধারদেনা করে এবং সুদে টাকা সংগ্রহ করে চার লাখ টাকা অপহরণকারীদের পাঠান। কিন্তু টাকা পাওয়ার পরও রাকিবকে মুক্তি দেওয়া হয়নি।

খাদেমুল ইসলাম বলেন, “ধার-দেনা করে মুক্তিপণ দিয়েছিলাম তাকে ফিরে পাওয়ার আশায়। টাকা দিয়েও ছেলেকে জীবিত পেলাম না।”

মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হয় বস্তাবন্দি মরদেহ

রাকিব নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। একপর্যায়ে রাজধানীর শুক্রাবাদ এলাকা থেকে মামুন রহমান (২৩) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামুনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৬ অক্টোবর নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ছাতনাই ইউনিয়নের বালাপাড়া গ্রামের একটি বাড়ির মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানটি মামুনের বাড়ির পাশের একটি সুপারিবাগান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরদিন সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, রাজধানীর শুক্রাবাদের একটি বাসায় রাকিবকে ঘাড় মটকে হত্যা করা হয়। পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে জীবিত দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছিল বলে জানায় পুলিশ।

জিপিএ-৫-এর আনন্দ ছাপিয়ে সন্তানের শোক

রাকিবের মা জাহুরা বেগমের স্বপ্ন ছিল, ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে। তার ভালো ফলাফল সেই স্বপ্নকে আরও উজ্জ্বল করার কথা ছিল। কিন্তু ছেলের সাফল্যের খবর এখন তাঁর কাছে আনন্দের বদলে বেদনার স্মারক।

জাহুরা বেগম বলেন, “ছেলের ভালো ফলাফলে কত স্বপ্ন দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে একদিন আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে।

“কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হল না। জিপিএ-৫ পাওয়ার আনন্দের বদলে এখন ছেলেকে হারানোর কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।”

ছেলের ভালো ফলাফল নিয়ে পরিবারের আনন্দ করার কথা ছিল উল্লেখ করে বাবা খাদেমুল ইসলাম বলেন, সেই আনন্দের খবর এখন ছেলেকে হারানোর শোক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন