সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

লাওসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিদ্যুৎ পাচ্ছে ভিয়েতনাম

চীনে নির্মিত ১৩৩টি টারবাইনে উৎপাদন হচ্ছে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ; তুলনামূলক কম খরচে জ্বালানি পাচ্ছে ভিয়েতনাম, লাওসেরও বাড়ছে উন্নয়নের সুযোগ।

দক্ষিণ লাওসের সবুজ পাহাড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে চীনে নির্মিত ১৩৩টি বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন। এসব টারবাইন থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি ভিয়েতনামের জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ‘মুনসুন উইন্ড পাওয়ার প্রকল্প’ একদিকে ভিয়েতনামের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সহায়তা করছে, অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্টে উৎপাদন শুরু করা প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্প সিঙ্গাপুরের সমান আয়তনের এলাকায় বিস্তৃত। এটি এশিয়ার প্রথম আন্তসীমান্ত বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র।

জলবিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে বায়ুশক্তির প্রসার

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গত কয়েক দশকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অসংখ্য বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে এসব কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে যায়। পাশাপাশি পরিবেশের ওপর বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতিতে বায়ুবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সময় এসেছে। লাওসের মুনসুন প্রকল্পকে তাঁরা এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা এনার্জি ল্যাব এশিয়ার কারিগরি কর্মসূচির প্রধান ট্রিস্টান বেলিংহাম এএফপিকে বলেন, অর্থনৈতিক হিসাব এখন বায়ুবিদ্যুতের পক্ষে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ২০ থেকে ৩০ বছর আগে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে যেমন জমি ব্যবহারের অনুমতি ও উন্নয়ন-অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতা দেখা গিয়েছিল, এখন বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও তেমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

লাওসে ইতোমধ্যে ৯০টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতেও আরও কয়েক ডজন কেন্দ্র চালু থাকায় নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উপযুক্ত স্থান খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

চীনের নির্মাণ, থাইল্যান্ডের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের মালিকানা

মুনসুন উইন্ড পাওয়ার প্রকল্পটি নির্মাণ করেছে চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। এর মালিকানায় রয়েছে থাইল্যান্ডের নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম।

প্রকল্পের উৎপাদিত বিদ্যুৎ নির্দিষ্ট সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে সরাসরি ভিয়েতনামের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে পৌঁছে যায়। এতে দুই দেশের বিদ্যুৎ খাতের মধ্যে আন্তসীমান্ত সংযোগ আরও জোরদার হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ ভিয়েতনাম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত। দেশটি আগে থেকেই প্রতিবেশী লাওস থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি করে আসছে। নতুন বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশটির বিদ্যুতের উৎস আরও বহুমুখী হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নতুন সড়ক ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ

লাওসের সেকং প্রদেশের ডাক ওয়াই গ্রামের বাসিন্দা ২৩ বছর বয়সী তুকতা ফনসালা এএফপিকে বলেন, পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা টারবাইনগুলোর দৃশ্য খুব সুন্দর। তাঁর ভাষায়, ‘দৃশ্যটা খুব সুন্দর। এগুলো গাছের চেয়েও বড়।’

তুকতা ও তাঁর সঙ্গে বসবাসকারী পরিবারের ১৮ সদস্যের পাশাপাশি টারবাইনের আশপাশের ধান ও কফিচাষিরাও প্রকল্পটির কারণে কিছু সুবিধা পেয়েছেন। প্রকল্পের আওতায় নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বেড়েছে।

তবে প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ তাঁদের এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভারী ঝড়ের সময় এখনো তাঁদের এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। লাওসের বিদ্যুৎ অবকাঠামো পুরোনো এবং রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থাটি বিপুল ঋণের বোঝায় রয়েছে।

তারপরও দেশের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিদেশে সরবরাহ করতে পেরে সন্তুষ্ট তুকতা। তিনি বলেন, ‘এটি উন্নয়নের জন্য ভালো এবং সমৃদ্ধি আনতে পারে।’

কম খরচে বিদ্যুৎ পাচ্ছে ভিয়েতনাম

মুনসুন প্রকল্প ভিয়েতনামের জন্য তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়ার একটি উৎস। ২০২৩ সালে খরার কারণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশটিতে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল।

এ ছাড়া পরিকল্পিত বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে আগামী বছর থেকে সংকটের ঝুঁকি রয়েছে বলে সেপ্টেম্বরে সতর্ক করেছিল ভিয়েতনাম সরকার।

ইন্দোচায়না এনার্জি পার্টনার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থমাস জ্যাকবসেন বলেন, মুনসুন প্রকল্পের মাধ্যমে ভিয়েতনাম স্থানীয়ভাবে বায়ুবিদ্যুৎ কেনার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম দামে লাওস থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছে।

তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থা ইলেকট্রিসিটি ভিয়েতনাম (ইভিএন) এ প্রকল্প থেকে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ প্রায় ৬ সেন্টে কিনছে। স্থানীয় বাজারের দামের তুলনায় এ হার ২ থেকে ৪ সেন্ট কম।

তবে গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের জন্য আয়োজিত এক সফরে মুনসুন উইন্ড, ইভিএন এবং প্রকল্পটির অর্থায়ন ব্যবস্থাপক এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রতিনিধিরা বিদ্যুতের এ দাম জানাতে অস্বীকৃতি জানান।

কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যেও ভূমিকা রাখবে প্রকল্প

২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার ভিয়েতনামের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও মুনসুন প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন ইভিএনের ন্যাশনাল পাওয়ার ট্রান্সমিশন করপোরেশনের কর্মকর্তা নিন সুয়ান হিয়েপ।

হ্যানয়ের একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে এএফপিকে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে লাওস থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ ভিয়েতনামের মোট স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশের সমান হবে। স্থাপিত সক্ষমতা বলতে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামর্থ্যকে বোঝায়।

এদিকে মুনসুন উইন্ড প্রকল্পের মহাব্যবস্থাপক নারুত বোয়াকাজর্ন জানিয়েছেন, প্রকল্পটির উৎপাদন সক্ষমতা আরও ১ হাজার মেগাওয়াট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বাড়তি বিদ্যুতের একটি অংশ লাওসের অভ্যন্তরে ব্যবহারের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।

একটি টারবাইনের নিচে এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নারুত বলেন, লাওসে বায়ু, পানি ও সৌরশক্তিসহ প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। একই জায়গায় এতগুলো ভালো নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস খুব বেশি দেশে নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

২৫ বছরের চুক্তিতে লাওসের আয় ১৮০ মিলিয়ন ডলার

নারুত বোয়াকাজর্নের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় মুনসুন প্রকল্প থেকে লাওস সরকার বিভিন্ন খাতে মোট ১৮০ মিলিয়ন ডলার আয় করবে। এর মধ্যে কর, স্থানীয় উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষা তহবিল থেকে পাওয়া অর্থও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রকল্পটি তাই শুধু ভিয়েতনামের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণেই ভূমিকা রাখছে না; লাওসের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির আঞ্চলিক প্রসারের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন