৭১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার প্রকল্প থেকে সরে এসে পিপিপি মডেলে উড়াল সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন প্রধানমন্ত্রী
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ২৩২ কিলোমিটার অংশ ছয় লেনে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাতিল করেছে সরকার। বৈদেশিক ঋণনির্ভর এ প্রকল্পের পরিবর্তে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় সম্পূর্ণ বা আংশিক এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দেশের প্রধান বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ করিডোর হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ক্রমবর্ধমান যানজট, বর্ষায় বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি ও সরবরাহব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই বিকল্প অবকাঠামো মডেল বিবেচনা করছে সরকার।
বৈদেশিক ঋণনির্ভর ছয় লেনের প্রস্তাব ফেরত
পরিকল্পনা কমিশনের নীতিগত অনুমোদন পাওয়ার পর গত ৮ অক্টোবর বৈদেশিক সহায়তা অনুসন্ধান কমিটি ৫৫ হাজার ৮০ কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণনির্ভর ছয় লেনের প্রস্তাবটি ফেরত পাঠায়। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, একই করিডোরে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সংশোধিত পরিকল্পনার কারণেই মূলত প্রস্তাবটি ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহনের ব্যাপক চাপ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে মাটির ওপর সড়ক সম্প্রসারণের পরিবর্তে পিপিপিভিত্তিক এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিন ধরনের নির্মাণ পরিকল্পনা মূল্যায়ন করছে সওজ
ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের জন্য তিনটি কাঠামোগত বিকল্প মূল্যায়ন করছে সওজ। বিকল্পগুলো হলো—
- পুরো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এলিভেটেড করা;
- করিডোরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশজুড়ে উড়াল সড়ক নির্মাণ;
- শুধু যানজটপ্রবণ এলাকাগুলোতে উড়াল অংশ নির্মাণ।
এসব বিকল্প নিয়ে একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করছে সওজ। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের মাধ্যমে প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। এক্সপ্রেসওয়ের চূড়ান্ত নকশা, পরিধি ও আর্থিক কাঠামো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেবেন সরকারপ্রধান।
সওজের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী পিপিপি মডেলে এগোনোর সিদ্ধান্ত দিলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে ইনভেস্ট বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। অন্যথায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বা অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে নতুন করে আলোচনা করা হবে।
সময় ও পরিবহন ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাণিজ্যিকভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর থেকে বিনিয়োগের বিপরীতে আয় পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে এই পথে যাতায়াতে আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের মাধ্যমে তা চার ঘণ্টার কাছাকাছি নামিয়ে আনা গেলে পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি খরচ ও সময়—সব ক্ষেত্রেই সাশ্রয় হবে। এ সুবিধার একটি অংশ টোল হিসেবে আদায় করা সম্ভব হলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদেরও প্রকল্পে আগ্রহী করা যেতে পারে।
‘শুধু মহাসড়ক প্রশস্ত করে সমস্যার সমাধান হবে না’
সরকারের পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেছেন, শুধু মাটির ওপর মহাসড়ক প্রশস্ত করলে যানজটের মূল সমস্যার সমাধান হবে না।
তাঁর মতে, সমতল সড়কের অন্যতম দুর্বলতা হলো প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের অভাব। পাশাপাশি সড়কের পাশে হাটবাজার ও ধীরগতির স্থানীয় যানবাহনের অবাধ চলাচলও যানজট বাড়ায়।
শামসুল হক বলেন, মহাসড়কটি ছয়, আট কিংবা ১০ লেনে সম্প্রসারণ করলেও করিডোরের যানজটের সমস্যা থেকে যাবে। সাম্প্রতিক সময়ে রক্ষণাবেক্ষণ ও বন্যার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট হয়েছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতির পাশাপাশি যাত্রীরা ফ্লাইট ধরতে পারেননি এবং রোগী পরিবহনও ব্যাহত হয়েছে।
তাঁর মতে, শুধু লেনের সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে সড়কের গতি, সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
পুরো করিডোরে প্রবেশাধিকার-নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়ের পরামর্শ
ড. শামসুল হক ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে সম্পূর্ণ এলিভেটেড ও প্রবেশাধিকার-নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, ইন্টারচেঞ্জভিত্তিক উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হলে ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা কমানো এবং বিদ্যমান সড়কের জন্য নির্ধারিত জমি বা রাইট অব ওয়ে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে মাটির ওপর থাকা সড়কে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিঘ্নিত হওয়ার নজির রয়েছে। এলিভেটেড অবকাঠামো নির্মিত হলে এ ধরনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় ও জটিলতা কমানোর পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নও তুলনামূলক দ্রুত হতে পারে।
পিপিপি মডেলে রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা
ড. শামসুল হকের মতে, প্রকল্পটি পিপিপি মডেলে বাস্তবায়ন করা যৌক্তিক। কারণ, এ ব্যবস্থায় বেসরকারি অপারেটরদের চুক্তির পুরো মেয়াদজুড়ে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকে।
তিনি বলেন, পিপিপি চুক্তির আওতায় দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বাধ্যবাধকতা থাকায় অবকাঠামোর মান ধরে রাখার সুযোগ বেশি। অন্যদিকে, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত সড়ক কয়েক বছরের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাঁর ভাষ্য, ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে পিপিপির আওতায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ দ্রুত শুরু করা উচিত। দেরি হলে বিদ্যমান মহাসড়কের ওপর চাপ বাড়বে এবং দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মহাসড়কে বাড়ছে যানবাহনের চাপ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের প্রধান বাণিজ্যিক ও যাত্রী চলাচলের করিডোর। বর্তমানে প্রতিদিন আনুমানিক ৩০ হাজার যানবাহন এ সড়ক ব্যবহার করে। গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালে এ সংখ্যা দৈনিক প্রায় ৬৬ হাজার এবং ২০৪০ সালে ১ লাখ ১৯ হাজারের বেশি হতে পারে।
দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি এই মহাসড়ক দিয়ে পরিবহন করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে দ্রুত ও পূর্বানুমানযোগ্য পণ্য পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছে। তাঁদের প্রত্যাশা, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে।
ব্যবসায়ীরা ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরেও একই ধরনের উচ্চগতির যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে উদ্যোগ
সওজের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের দিকে বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা প্রথম ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সুপারিশ করেন। তবে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে মতপার্থক্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উদ্যোগটি বাস্তবায়নের বাইরে রয়েছে।
কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও দেরি হলে নির্মাণব্যয় দ্রুত বাড়তে পারে। কারণ, বিদ্যমান মহাসড়কের দুই পাশে অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠায় ভবিষ্যতে ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ আরও জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।

