শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

উখিয়ায় গ্যাসের আগুন পঞ্চম দিনেও জ্বলছে, ১৫ দিন পর্যবেক্ষণে থাকবে কর্তৃপক্ষ

লার ১৫ দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে বাপেক্স-পেট্রোবাংলা; এখনই গ্যাসক্ষেত্র বলার সুযোগ নেই, হতে পারে থ্রিডি সাইসমিক জরিপ।

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন পঞ্চম দিনের মতো জ্বলছে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ভূগর্ভে বড় কোনো গ্যাসের আধার রয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে গবেষণা ও বিস্তারিত জরিপ ছাড়া এটিকে গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) কর্মকর্তারা।

বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ভূগর্ভে বড় গ্যাসের আধার থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে গবেষণা ও পরবর্তী জরিপ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “সম্ভাবনা তো অবশ্যই আছে। তবে বিষয়টা গবেষণানির্ভর।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদে ঘটনাটিকে দেশের ৩১তম গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। আরহামের ভাষ্য, এ পর্যায়ে এমন দাবি করার সুযোগ নেই।

নলকূপ খননের পর বের হতে শুরু করে গ্যাস ও পানি

গত ২৭ অক্টোবর উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছোট ইনানী এলাকায় মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তির বাড়ির আঙিনায় নলকূপ বসানোর জন্য প্রায় এক হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করা হয়। পানি না পাওয়ায় পাইপ ও খননকাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম তুলে নেওয়ার পর সেখান থেকে গ্যাস ও পানি বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে গ্যাসে আগুন ধরে যায়। এরপর থেকে আগুন জ্বলছে।

বাপেক্সের কর্মকর্তারা বলছেন, পাহাড়ি এলাকায় এক হাজার ফুট গভীরতার মধ্যে বড় কোনো গ্যাসের আধার থাকার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করা যায় না। তবে গভীরের কোনো বড় গ্যাসের আধারের সঙ্গে এ ঘটনার সংযোগ রয়েছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ ও জরিপের পরই বোঝা যাবে।

১৫ দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে বাপেক্স-পেট্রোবাংলা

ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ১৫ দিন সময় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স। আগুনের উচ্চতা ও তীব্রতা একই থাকলে বা বেড়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণে ভূগর্ভ থেকে ‘রিলিফ ওয়েল’ খননের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

পেট্রোবাংপরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন্স) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, বাপেক্স, পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠকের পর প্রাথমিকভাবে ১৫ দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সময় আগুনের উচ্চতা ও তীব্রতা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরপরও পরিস্থিতি একই থাকলে পরবর্তী কারিগরি পদক্ষেপ নিয়ে ভাবা হবে।

তিনি জানান, অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস নির্গমন বন্ধ করতে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভের মূল নির্গমনস্থল থেকে পাশ কাটিয়ে বা ‘সাইড ট্র্যাক’ করে রিলিফ ওয়েল খননের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

শোয়েব বলেন, আগুনের উচ্চতা বেড়ে গেলে বা একই রকম থাকলে রিলিফ ওয়েল খননের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তবে গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা স্বাভাবিকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আগুনের রং দেখে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতির ধারণা

ঘটনাস্থলে রাতে গিয়ে আগুনের রং পর্যবেক্ষণ করেছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা। প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, আগুনের রং কালো দেখা যাচ্ছে। এ থেকে গ্যাসের সঙ্গে তেল বা কনডেনসেটজাতীয় উপাদান থাকতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। তবে এখনই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

বাপেক্সের কর্মকর্তা এস এম নাফিফুন আরহামও বলেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে গ্যাসে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতির ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। তবে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ ছাড়া তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, “এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে আছে। আমরা ধারণা করছি, এর মধ্যে হায়ার হাইড্রোকার্বন বেশ আছে। কিন্তু ল্যাবরেটরিতে অ্যানালাইসিস ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।”

এখনও গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা যায়নি বলে জানান তিনি। আগুনের কাছে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় নমুনা সংগ্রহের জন্য নিরাপদ স্থানও পাওয়া যায়নি।

থ্রিডি সাইসমিক জরিপের পরিকল্পনা

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর ঘটনাস্থলে থ্রিডি সাইসমিক জরিপ করার পরিকল্পনা করছে বাপেক্স। পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব বলেন, এ জরিপের মাধ্যমে ভূগর্ভের গঠন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হবে।

জরিপের ফলাফল থেকে সেখানে সম্ভাব্য গ্যাসের আধার থাকলে তার অবস্থান এবং অর্থনৈতিকভাবে তা উত্তোলনযোগ্য কি না, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

প্রাথমিকভাবে বিশেষজ্ঞরা এটিকে অগভীর বা ‘শ্যালো রিজার্ভ’ হওয়ার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। কারণ, বাংলাদেশে সাধারণত আরও গভীরে গ্যাসের আধার পাওয়া যায়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ধারণাও এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের।

ভূমিধসের ঝুঁকিও বিবেচনায়

গ্যাস নির্গমনের কারণে ভবিষ্যতে মাটি বসে যাওয়া বা ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

বাপেক্সের কর্মকর্তা নাফিফুন আরহাম বলেন, এ ধরনের ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দেশে ও দেশের বাইরে এ ধরনের ঘটনায় মাটি বসে যাওয়ার নজির রয়েছে। ভূগর্ভে বালির পরিমাণ বেশি হলে ভূমি ধসে যাওয়া বা ‘সাবসিডেন্সের’ ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তবে এ মুহূর্তে ঘটনাস্থল ও আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাঁদের প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানান তিনি।

“কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে যাতে জানমালের ক্ষতি না হয়, সেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই আমরা এগোচ্ছি,” বলেন তিনি।

বাপেক্সের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ দল পর্যায়ক্রমে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে বলেও জানান নাফিফুন আরহাম।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন