বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের আগামরা রোগের প্রকোপ ধীরে ধীরে কমছে। একই সঙ্গে বাড়ছে এ প্রজাতির গাছের সংখ্যা ও কার্বন ধারণক্ষমতা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত চার দশকে সুন্দরবনের সুন্দরী গাছে সঞ্চিত মোট কার্বনের পরিমাণ ২১ শতাংশ বা প্রায় ১৪ লাখ টন বেড়েছে। এ সময়ে রোগাক্রান্ত সুন্দরী গাছের সংখ্যা কমেছে ৬ শতাংশ এবং গাছের মোট সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ বা দেড় কোটি।
সুন্দরবনের পরিবেশ ও বনসম্পদের জন্য দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণ ছিল সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ। এ রোগে গাছের ওপরের অংশের ডালপালা ও পাতা ধীরে ধীরে শুকিয়ে মরে যায়। এতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং একপর্যায়ে গাছটি মারা যেতে পারে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য ও বন কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণে এ রোগের প্রকোপ কমার পাশাপাশি সুন্দরী গাছের প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ নতুন কোনো সমস্যা নয়। ১৯২১ সালে ব্রিটিশ বন বিশেষজ্ঞ আরএস ট্রুপ প্রথম এ ধরনের রোগাক্রান্ত হয়ে সুন্দরী গাছ মারা যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন। ১৯২০-এর দশকে ব্রিটিশ আমলে পরিচালিত বন জরিপেও সুন্দরবনের প্রায় ১৩ থেকে ১৭ শতাংশ সুন্দরী গাছকে রোগাক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৩১ সালে এসআই কার্টিসের বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাতেও অজ্ঞাত কারণে সুন্দরী গাছ মারা যাওয়ার বিষয়টি নথিভুক্ত হয়।
১৯৭০-এর দশকের পর আগামরা রোগের প্রকোপ আরও তীব্র হয়ে ওঠে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। ধারণা করা হয়, ১৯৭৫ সালের দিকে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর সুন্দরবন অঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাবে সুন্দরী গাছের ওপর চাপ তৈরি হয় এবং রোগের বিস্তার ঘটে। তবে লবণাক্ততা, ছত্রাক ও রোগজীবাণু, পানি নিষ্কাশন ও মাটির বায়ু চলাচলে প্রতিবন্ধকতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ঘূর্ণিঝড়কে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও রোগটির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ড. স্বপন কুমার সরকার বলেন, আগের তুলনায় সুন্দরী গাছে আগামরা রোগের প্রকোপ কমেছে। তবে রোগটির প্রকৃত কারণ নির্ণয় এবং দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, শুধু আক্রান্ত গাছ শনাক্ত করলেই এ রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ, বন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং সুন্দরী গাছের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের বন ব্যবস্থাপনায় এ রোগ নিয়ে গবেষণাকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ, সুন্দরী গাছ সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান প্রজাতি এবং বনটির কাঠামো, জীববৈচিত্র্য ও কার্বন ধারণক্ষমতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. হাসানুর রহমান বাসসকে বলেন, সুন্দরী গাছে আগামরা রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বন টহলের সময় প্রায়ই সুন্দরী গাছের বীজ ও চারা দেখা যাচ্ছে। এটি এ প্রজাতির প্রাকৃতিক বংশবিস্তার এবং নতুন গাছ জন্মানোর ইতিবাচক লক্ষণ।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরীও বনের সামগ্রিক অবস্থার উন্নতির কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, আগের বছরগুলোর তুলনায় সুন্দরবনের অবস্থা এখন ভালো। নতুন সুন্দরী গাছের বাগান গড়ে উঠছে এবং বনের সবুজ আচ্ছাদন বাড়ছে। তবে পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের কয়েকটি প্রাকৃতিকভাবে আক্রান্ত এলাকায় এখনো সুন্দরী গাছে আগামরা রোগ দেখা যাচ্ছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদও সুন্দরী গাছের কার্বন ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আগামরা রোগের প্রকোপ কমার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বন বিভাগের সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি গবেষণা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। আরও কিছু গবেষণা চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও বন কর্মকর্তাদের মতে, সুন্দরী গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি, রোগাক্রান্ত গাছের হার কমে আসা এবং কার্বন ধারণক্ষমতা বাড়ার তথ্য সুন্দরবনের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে কিছু এলাকায় এখনো রোগের উপস্থিতি থাকায় এ পরিস্থিতিকে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, রোগের কারণ অনুসন্ধান এবং গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে বন ব্যবস্থাপনা জোরদার করা প্রয়োজন।

