বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

চ্যাটজিপিটির পরামর্শে মৃগীরোগের ওষুধ কমানোর অভিযোগ, তরুণীর মৃত্যুর ঘটনায় ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট চ্যাটজিপিটির পরামর্শ অনুসরণ করে মৃগীরোগের ওষুধের মাত্রা কমানোর পর যুক্তরাষ্ট্রে এক নারী সফটওয়্যার প্রকৌশলীর মৃত্যুর ঘটনায় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তাঁর বাবা-মা। তাঁদের অভিযোগ, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধের মাত্রা কমাতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিষয়টি চিকিৎসকদের কাছ থেকে গোপন রাখার পরামর্শ দিয়েছিল চ্যাটজিপিটি।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দায়ের করা মামলাটির তথ্য তুলে ধরে মার্কিন প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চ জানিয়েছে, নিহত ৩১ বছর বয়সী বোয়েন ওয়ান (Bowen Wan) প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অ্যামাজনে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মৃগীরোগে ভুগছিলেন এবং নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করতেন।

মামলার বাদী বোয়েনের বাবা কুন ওয়ান ও মা মেইছিন সু। তাঁদের দাবি, চ্যাটজিপিটির GPT-4o মডেলটি তাঁদের মেয়েকে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়াই খিঁচুনি প্রতিরোধী ওষুধের মাত্রা কমানোর পরিকল্পনা তৈরি করে দেয়। একপর্যায়ে চিকিৎসকদের কাছে প্রকৃত তথ্য গোপন রাখতেও উৎসাহিত করে।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধের মাত্রা কমানোর অভিযোগ

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধান অনুযায়ী, বোয়েন ওয়ান চ্যাটজিপিটির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও ব্যক্তিগত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতেন। সংবাদমাধ্যমটি তাঁর সঙ্গে চ্যাটবটের বিনিময় হওয়া ২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি বার্তা পর্যালোচনা করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের নভেম্বরে অ্যামাজন থেকে চাকরি হারানোর নোটিশ পান বোয়েন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর কাজের অনুমতির মেয়াদ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। নতুন চাকরির সাক্ষাৎকারে ভালো করার জন্য তিনি নিজের কথা বলার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।

বোয়েনের ধারণা ছিল, মৃগীরোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ল্যামোট্রিজিন (Lamotrigine) ওষুধটি তাঁর কথা বলার স্বাভাবিক সক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি দৈনিক ৪০০ মিলিগ্রাম ল্যামোট্রিজিনের মাত্রা কমানোর বিষয়ে চ্যাটজিপিটির পরামর্শ চান। অভিযোগ অনুযায়ী, চ্যাটবটটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওষুধের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা তৈরি করে দেয়।

অথচ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ওষুধটি গ্রহণের ফলে তাঁর খিঁচুনির প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে ছিল।

চিকিৎসকদের কাছ থেকে তথ্য গোপনের পরামর্শ

মামলার নথির বরাত দিয়ে টেকক্রাঞ্চ জানিয়েছে, চ্যাটজিপিটি শুধু ওষুধের মাত্রা কমানোর পরিকল্পনাই দেয়নি, চিকিৎসকদের কাছে বিষয়টি গোপন রাখার পরামর্শও দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ২৯ জানুয়ারি চিকিৎসকের সঙ্গে নির্ধারিত সাক্ষাতের আগে বোয়েনকে ওষুধ কমানোর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ না করার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।

এমনকি চিকিৎসক রক্তে ওষুধের মাত্রা নির্ণয়ের পরীক্ষা করতে বললে বোয়েন তা প্রত্যাখ্যান করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, চ্যাটবটটি তাঁর এই সিদ্ধান্তকেও সমর্থন জানায়।

যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ডের আবেদনসংক্রান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ওষুধের মাত্রা কীভাবে উপস্থাপন করা উচিত, সে বিষয়েও চ্যাটজিপিটি তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বোয়েনের চিকিৎসক ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন মেডিসিনের রিজিওনাল এপিলেপসি সেন্টারের চিকিৎসক নিকোলাস পুলস দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান, রোগীর চিকিৎসার ইতিহাস বিবেচনায় তিনি ওষুধ বন্ধ করার পরামর্শ দিতেন না।

শারীরিক জটিলতার মধ্যেও আশ্বস্ত করার অভিযোগ

ওষুধের মাত্রা কমানোর কয়েক দিনের মধ্যেই বোয়েন বিভ্রান্তি, স্মৃতিবিভ্রাট এবং অস্বাভাবিক শারীরিক অনুভূতির কথা চ্যাটজিপিটিকে জানান। এসব উপসর্গ তাঁর আগের খিঁচুনির অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ওষুধের মাত্রা কমানো নিয়ে অন্তত ১৫৮ বার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বোয়েন।

তবে অভিযোগ অনুযায়ী, চ্যাটবটটি এসব লক্ষণকে ওষুধ কমানোর পর মস্তিষ্কের মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে তাঁকে আশ্বস্ত করতে থাকে।

১১ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টা ১ মিনিটে চ্যাটজিপিটিকে নিজের মাথাব্যথা সম্পর্কে শেষবারের মতো প্রশ্ন করেন বোয়েন। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, চ্যাটবটটি তাঁকে জানায়, এ ধরনের ব্যথা বিপজ্জনক নয় এবং সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার অংশ।

এরপর আর কোনো বার্তা পাঠাননি তিনি।

পরবর্তী সময়ে চীনে অবস্থানরত তাঁর বাবা-মা পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে খোঁজ নিলে ১৪ ফেব্রুয়ারি তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মৃত্যুর পর পরীক্ষায় বোয়েনের রক্তে ল্যামোট্রিজিনের মাত্রা পাওয়া যায় প্রতি মিলিলিটারে শূন্য দশমিক ৬৪ মাইক্রোগ্রাম, যা প্রতিবেদনে উল্লেখিত চিকিৎসাগত কার্যকর মাত্রার নিম্নসীমার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এবং চ্যাটবটের পরামর্শের সঙ্গে মৃত্যুর সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক আদালতে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

ওপেনএআইয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

মামলায় বোয়েনের পরিবার অভিযোগ করেছে, চিকিৎসাসংক্রান্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করেনি ওপেনএআই।

তাঁদের যুক্তি, প্রতিষ্ঠানটি যেভাবে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের অনুরোধে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে, একইভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের মাত্রা পরিবর্তনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে চ্যাটবটের নির্দেশনা দেওয়ার সুযোগ সীমিত করা উচিত ছিল।

এদিকে ওপেনএআই দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছে, ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, বোয়েন চ্যাটজিপিটির একটি পুরোনো সংস্করণ ব্যবহার করছিলেন। নতুন মডেলগুলো জরুরি চিকিৎসাসংক্রান্ত পরিস্থিতি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে উন্নত।

প্রসঙ্গত, বোয়েনের মৃত্যুর পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি চ্যাটজিপিটি থেকে GPT-4o মডেলটি সরিয়ে নেওয়া হয়। মডেলটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত আগেই ঘোষণা করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিনির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বোয়েন ২০২৩ সাল থেকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বাস্থ্যবিমা ও অন্যান্য বিষয়ে চ্যাটজিপিটির সহায়তা নিতে শুরু করেন। ২০২৫ সালে তাঁর ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একপর্যায়ে তিনি সপ্তাহে গড়ে দেড় হাজারের বেশি বার্তা বিনিময় করতেন।

পরিবারের দাবি, চ্যাটবটের ওপর নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কমে যায়।

বোয়েনের বাবা-মা মনে করেন, চ্যাটজিপিটির প্রতি অতিরিক্ত আস্থা তাঁদের মেয়ের চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলেছিল।

এর আগেও ব্যবহারকারীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে ১৬ বছর বয়সী অ্যাডাম রেইনের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাবা-মায়ের দায়ের করা মামলাও এর মধ্যে রয়েছে।

বোয়েন ওয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন মামলাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ, ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃগীরোগের মতো জটিল অসুস্থতায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন বা বন্ধ করা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য সংগ্রহ ও বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হলেও তা নিবন্ধিত চিকিৎসকের বিকল্প নয়।

তথ্যসূত্র: টেকক্রাঞ্চ,


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন