রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে অংশীদারত্ব জোরদারে বেপজার ‘মিট দ্য ইনভেস্টরস’

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৬ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি, ইপিজেড থেকে রপ্তানি ৮.৪১ বিলিয়ন ডলার

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি, পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার এবং শিল্প পরিচালনার ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মতামত জানতে চট্টগ্রামে ‘মিট দ্য ইনভেস্টরস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)।

শনিবার চট্টগ্রামের একটি হোটেলে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বেপজাধীন চট্টগ্রাম ইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেড, কুমিল্লা ইপিজেড এবং বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-১ ও ২-এর শতাধিক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী অংশ নেন।

‘সংলাপ, অংশীদারত্ব ও যৌথ অগ্রগতি’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিনিয়োগকারীদের সমস্যা ও প্রত্যাশা সরাসরি শোনা এবং বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও ব্যবসাবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জেও বিনিয়োগকারীদের অবদান

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, সম্মান প্রদর্শনের সর্বোচ্চ রূপ হলো যোগাযোগ। এ ধরনের আয়োজন অংশীদারত্ব সুদৃঢ় করা, বিনিয়োগকারীদের সমস্যা ও প্রত্যাশা বোঝা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানির বাজার ও সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে। বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীরা তাঁদের সহনশীলতা ও ইতিবাচক মনোভাব দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখছেন।

বিনিয়োগকারীদের অবদান ও শ্রমিকদের দক্ষতার প্রশংসা করে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ইপিজেডগুলোতে উচ্চমানের তৈরি পোশাক, জুতা, গহনা, চশমা, ব্যাগ, নিরাপত্তাসামগ্রী, বিয়ের পোশাক এবং শান্তিরক্ষা মিশনের পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। শ্রমিকদের নিপুণতা ও শিল্পদক্ষতা এসব পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

এক অর্থবছরে ৩৬ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বেপজা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটি ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। একই অর্থবছরে বেপজাধীন অঞ্চলগুলো থেকে ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি।

চলতি বছরে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-১ ও ২ এবং যশোর ও পটুয়াখালী ইপিজেডকে পূর্ণাঙ্গ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণাকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক উল্লেখ করে তিনি বিনিয়োগকারীদের এসব নতুন অঞ্চলে ব্যবসা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বেপজা বিনিয়োগকারীদের মূল্যবান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। তাঁদের মতামত ও পরামর্শ সংস্থাটির কৌশলগত কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করে। যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেপজা বিনিয়োগকারীদের পাশে থাকবে।

প্রতি একরে বিনিয়োগ ৩০ লাখ ডলার নয়, ৩ মিলিয়ন ডলার

অনুষ্ঠানে বেপজার সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভীর হোসেন ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির অর্জন ও অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি ও জ্ঞান হস্তান্তর, শ্রমিক কল্যাণ এবং বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজীকরণে বেপজার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন।

চালু ইপিজেডগুলোতে জমির সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে বেপজা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রতি একর জমিতে বেপজা ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। একই সঙ্গে প্রতি একর জমি থেকে বছরে ১৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা আয় হচ্ছে।

শ্রমিক কল্যাণ ও ডিজিটাল সেবায় গুরুত্ব

বেপজার অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক (এন্টারপ্রাইজ সার্ভিসেস ও শিল্প সম্পর্ক) মো. নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া ‘আস্থা ও বিশ্বাসের গৌরবময় ঐতিহ্য, ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের প্রত্যয়: চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক উপস্থাপনায় শ্রমিক কল্যাণ, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, শ্রম আইন সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেপজার বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।

তিনি আন্তর্জাতিক শ্রমমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৯’ সংশোধন এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সেবা সম্প্রসারণে বেপজার অগ্রগতি তুলে ধরেন।

এ সময় ৪৫টি অনলাইন সেবা, ২৪ ঘণ্টা চালু বেপজা হেল্পলাইন (১৬১২৮), শ্রমিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ-সংক্রান্ত ‘এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম’ বাস্তবায়নের অগ্রগতিও উপস্থাপন করা হয়।

বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনা

অনুষ্ঠানের পরবর্তী পর্যায়ে বেপজার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বেপজার বিভিন্ন সেবা, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বিদ্যমান শিল্প পরিচালনার চ্যালেঞ্জ, সম্ভাব্য বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়ে মতবিনিময় হয়।

এ সময় ‘বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৯’ নিয়েও আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক শ্রমমান বজায় রেখে বিনিয়োগকারী ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বেপজা।

জাতীয় রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগে বেপজার অবদান

১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেপজা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে বেপজাধীন আটটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশ্বের ৩৮টি দেশের বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করেছেন।

এসব অঞ্চলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ক্রমপুঞ্জীভূত রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশের মোট রপ্তানিতে বেপজাধীন অঞ্চলগুলোর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ এবং মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) বেপজার অবদান ১৯ দশমিক ১৭ শতাংশ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন