এক কোটি টাকার কথিত চুক্তি, ২৩ লাখ টাকা গ্রহণ ও কর্মচারীদের বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ; দুদক, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগের দাবি
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত বলে দাবি করা একটি আমগাছ কাটার চেষ্টা, গোডাউনের নামে দোকান নির্মাণ, কথিত অর্থ লেনদেন, অ্যাম্বুল্যান্সের ভাড়া আদায় এবং সাধারণ কর্মচারীদের বদলি-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সভাপতি মো. আজিম ও সাধারণ সম্পাদক মো. শিপনসহ কয়েকজন কর্মচারী ও কর্মকর্তা।
অভিযোগকারীদের দাবি, হাসপাতালের সমিতির ঘরের পাশে একটি আমগাছ কেটে সেখানে দোকান নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ দোকান নির্মাণ ও হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলামের ছেলে মো. নাসির উদ্দিনের সঙ্গে প্রায় এক কোটি টাকার কথিত চুক্তি হয়েছে। এর বিপরীতে আজিম ও শিপন মিলে প্রায় ২৩ লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া হাসপাতালের ভেতরে ও আশপাশে দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া, ফুটপাতের দোকান থেকে অর্থ আদায়, কর্মচারীদের এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে কিংবা এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে বদলির বিনিময়ে অর্থ নেওয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন কর্মচারী। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছাড়া কোনো অভিযোগকেই প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
এক কোটি টাকার কথিত চুক্তি, ২৩ লাখ টাকা গ্রহণের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের সমিতির ঘরের পাশে দোকান নির্মাণ ও তা হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে ডা. রফিকুল ইসলামের ছেলে মো. নাসির উদ্দিনের সঙ্গে প্রায় এক কোটি টাকার চুক্তি করা হয়েছে। ওই চুক্তির বিপরীতে নাসির উদ্দিনের কাছ থেকে আজিম ও শিপন প্রায় ২৩ লাখ টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে কথিত চুক্তির কোনো কপি, অর্থ লেনদেনের রসিদ বা ব্যাংকিং নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। অর্থ কীভাবে গ্রহণ করা হয়েছে, লিখিত চুক্তি ছিল কি না, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট সমিতির অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
হাসপাতালের জায়গা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের আইনগত ভিত্তি এবং সেখানে দোকান নির্মাণের অনুমোদন রয়েছে কি না, তা-ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ঐতিহ্যবাহী আমগাছ কাটার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, সমিতির ঘরের পাশে অবস্থিত একটি আমগাছ কেটে সেখানে দোকান নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গাছটি ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে গাছটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং সেটি কাটার উদ্যোগের বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
গাছটি কাটার অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে নতুন স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন রয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট জায়গাটি কী উদ্দেশ্যে বরাদ্দ—এসব বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য প্রয়োজন।
দুদক, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আজিম ও শিপনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে কথিত এক কোটি টাকার চুক্তি, ২৩ লাখ টাকা গ্রহণ, গাছ কাটার চেষ্টা এবং দোকান নির্মাণের উদ্যোগ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
তবে অভিযোগপত্রের গ্রহণপত্র, স্মারক নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বক্তব্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে কি না এবং এ বিষয়ে কোনো তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অ্যাম্বুল্যান্সের ভাড়া আদায় নিয়েও অভিযোগ
ঢামেক হাসপাতালে অ্যাম্বুল্যান্স পরিচালনা ও ভাড়া আদায় নিয়েও আজিম ও শিপনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে কিউআর কোডসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার ঘটনা রয়েছে।
তবে নির্ধারিত ভাড়া, প্রকৃত আদায়, রসিদ এবং কিউআর কোডের লেনদেনের রেকর্ড যাচাই ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি এবং রোগী ও তাঁদের স্বজনদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, কথিত অর্থ গ্রহণের পর সাধারণ সম্পাদক শিপন সপরিবারে হজ পালন করতে যান। তবে হজে যাওয়ার বিষয়টি নিজে কোনো আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ নয়। কথিত অর্থ লেনদেনের সঙ্গে এ সফরের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
কর্মচারীদের বদলি-বাণিজ্য ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ
হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীর অভিযোগ, সমিতির কিছু নেতা কর্মীদের এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে কিংবা এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে বদলি করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নিচ্ছেন। তাঁদের দাবি, এ ধরনের কার্যক্রমে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শিপন, সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ সুমন আলী, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোহাম্মদ শাকিল আহমেদ জনি এবং মোহাম্মদ অরুফসহ আরও কয়েকজন জড়িত।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, হাসপাতালের ভেতরে ও আশপাশে দোকান বসানো, খালি জায়গা দখল করে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ এবং ফুটপাতের দোকান থেকে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে। এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট আর্থিক নথি, বদলির আদেশ, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মচারীর অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। তাঁদের দাবি, কর্মচারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং বদলি ও অন্যান্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অর্থের প্রভাব রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় বদল ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মচারী অতীতে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে সমিতির কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁদের কয়েকজন বিএনপি ও যুবদলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার পরিচয় দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগের চেয়ে হাসপাতালের সম্পদ ব্যবস্থাপনা, কর্মচারীদের বদলি, অর্থ লেনদেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনিয়ম হয়েছে কি না—এসব বিষয় নথি ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তদন্ত করা জরুরি।
কর্মকর্তাদের সহযোগিতার অভিযোগ
অভিযোগকারীরা হাসপাতালের উপপরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. আশরাফুল আলম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাউল এবং সহকারী হেড ক্লার্ক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সহযোগিতা করার অভিযোগ তুলেছেন।
তাঁদের দাবি, হাসপাতালের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, পদোন্নতি ও চাকরিসংক্রান্ত কার্যক্রমে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কয়েকজন কর্মচারী আরও অভিযোগ করেছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাবের কারণে হাসপাতালের সাধারণ কর্মচারী ও ঠিকাদাররা সমস্যায় পড়ছেন।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট টেন্ডার নথি, পদোন্নতির আদেশ, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে প্রশাসনিক নথি ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
বক্তব্য জানতে যোগাযোগ
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সভাপতি মো. আজিমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অন্যদিকে, সাধারণ সম্পাদক মো. শিপনের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি সরাসরি দেখা করার কথা বলেন। শিপন বলেন, “সরাসরি আসেন, আপনি আমাদের সঙ্গে বসুন, কথা বলুন এবং চায়ের দাওয়াত নিন।” এরপর অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য না দিয়েই তিনি ফোন কেটে দেন।
এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত অন্য অভিযুক্ত ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংযোজন করা প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
ঢামেক হাসপাতালের ভেতরে আমগাছ কাটার চেষ্টা, দোকান নির্মাণ, কথিত অর্থ লেনদেন, অ্যাম্বুল্যান্সের ভাড়া আদায় এবং কর্মচারীদের বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
কথিত চুক্তিপত্র ও অর্থ লেনদেনের নথি যাচাই, হাসপাতালের জায়গা বরাদ্দ ও স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন পরীক্ষা, অ্যাম্বুল্যান্সের ভাড়া আদায়ের হিসাব পর্যালোচনা এবং কর্মচারীদের বদলিসংক্রান্ত আদেশ খতিয়ে দেখার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, তা এখন দেখার বিষয়।

