ইংরেজি শিক্ষকের প্রায় ৮০ শতাংশ ও গণিত শিক্ষকের ৮৫ শতাংশের বেশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী নন; প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হারও এক দশকে কমেছে
বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি ও গণিত শিক্ষকদের বড় একটি অংশেরই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। ইংরেজি পড়ানো শিক্ষকদের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং গণিত পড়ানো শিক্ষকদের ৮৫ শতাংশের বেশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী নন। বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের এই ঘাটতি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মানকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদেরা।
‘বাংলাদেশ এডুকেশন স্ট্যাটিসটিকস ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি পড়ানো ৬৪ হাজার ২৫৩ জন শিক্ষকের মধ্যে মাত্র ১২ হাজার ৮৯৩ জন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। অন্যদিকে, গণিত পড়ানো ৬৭ হাজার ৬৯৭ জন শিক্ষকের মধ্যে এ ধরনের ডিগ্রি রয়েছে মাত্র ৯ হাজার ৯১৮ জনের।
বিষয়ভিত্তিক উচ্চতর ডিগ্রির ঘাটতির পাশাপাশি কমেছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হারও। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার ছিল প্রায় ৭৩ শতাংশ। এক দশক পর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে। অর্থাৎ, এ সময়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার কমেছে ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশীয় পয়েন্ট।
শিক্ষাবিদদের মতে, গণিত ও ইংরেজির মতো মৌলিক বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা এবং বিদ্যমান শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে জরুরি।
বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের ঘাটতি ও গাইড বইনির্ভরতা
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, দেশে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান না থাকলে একজন শিক্ষকের পক্ষে বিষয়টি ভালোভাবে পড়ানো কঠিন।
তিনি বলেন, “যে শিক্ষক যে বিষয় পড়াবেন, তাতে তার উচ্চতর জ্ঞান না থাকলে সেই বিষয়ে ভালো পড়ানোর কথা না। এসব কারণেই শিক্ষকদের গাইড বইয়ের শরণাপন্ন হতে হয়।”
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট কাটাতে নতুন শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন রাশেদা কে চৌধুরী।
তিনি বলেন, “এখন দেশে প্রচুর শিক্ষিত যুবক আছেন। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যায়। এসব বিষয়ে তৎপরতা বাড়াতে হবে। আর আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে গাইড বইয়ের সিন্ডিকেট থেকে মুক্ত করতে হবে।”
এক বিষয়ে ডিগ্রি, পড়াতে হচ্ছে অন্য বিষয়
শুধু পরিসংখ্যানেই নয়, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকটের চিত্র পাওয়া যায়। অনেক শিক্ষককে নিজের উচ্চশিক্ষার বিষয় থেকে আলাদা বিষয়ে পাঠদান করতে হচ্ছে।
তেজগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা মাজেদা মুজিব বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেও বর্তমানে ইতিহাস পড়াচ্ছেন।
তিনি বলেন, “সংশ্লিষ্ট বিষয়ে না পড়লেও আমি ইতিহাস পড়াই এবং এবার ছাত্রছাত্রীরা ইতিহাসে অসম্ভব ভালো রেজাল্ট করেছে।”
তবে গণিত ও ইংরেজির মতো বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
মাজেদা মুজিব বলেন, “গণিতের শিক্ষক নেই আমাদের। বারবার মাউশিতে চেয়েও পাননি আমাদের হেডমাস্টার। সায়েন্সে যারা ফিজিক্স পড়ান, তারাই গণিত পড়াচ্ছেন।”
নাটোরের গৌরীপুর উচ্চবিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেও দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজি পড়াচ্ছেন। তাঁর শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ডিগ্রি না থাকায় তাঁকে নিজ উদ্যোগে ইংরেজিতে বাড়তি পড়াশোনা করতে হয়েছে।
ওই শিক্ষক বলেন, “আমাকে দীর্ঘদিন নিজে ইংরেজি বিষয়ে বিশেষভাবে পড়াশোনা করে শিক্ষকতা করতে হয়েছে। বাচ্চারা ভালো ফলাফল করছে। সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি থাকলে আমার শিক্ষকতা হয়তো আরেকটু সহজ হতো।”
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগে গুরুত্ব
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আখতারুজ্জামান বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ এখন বাস্তবতা। আগে বিষয়ভিত্তিক নিয়োগের ব্যবস্থা ছিল না; গ্রুপভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হতো।
তিনি বলেন, “ফলে সায়েন্স গ্রুপের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও তাকে যে গণিতের শিক্ষকই হতে হবে, এমনটা নয়। কেউ বিএসসি করেছেন, কিন্তু তাকে অন্য বিষয়ও পড়াতে হয়েছে। এভাবে একজন শিক্ষককে বিজ্ঞানের সব বিষয়ই পড়াতে হতো।”
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যদি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে চাই, তাহলে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া উচিত।”
কিছু প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক নিয়োগের চর্চা
কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের উচ্চতর ডিগ্রির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিষয়ভিত্তিক নিয়োগের চর্চা রয়েছে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম বলেন, “আমরা চেষ্টা করি, যে বিষয়ে শিক্ষকেরা উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন, তাদের সেই বিষয়েই নিয়োগ দেওয়ার। আমাদের প্রতিষ্ঠানে ৮০ শতাংশ শিক্ষক এ নিয়মেই শিক্ষকতা করছেন। বাকি কিছু শিক্ষক অন্য ডিসিপ্লিনের, তারা গ্রুপভিত্তিক বিষয়গুলো পড়ান।”
একইভাবে ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজের গণিত শিক্ষক অনাদিনাথ মণ্ডল গণিতেই উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। তিনি বলেন, “আমি বহুদিন ধরে গণিতই পড়াই। তবে মাঝেমধ্যে বিজ্ঞান বিষয়েও বুঝিয়ে থাকি। ওই বিষয়টা আমি ভালো বুঝি। তবে আমাদের এখানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের নির্দিষ্ট শিক্ষককেই ক্লাস দেওয়া হয়।”
শিক্ষাবিদ মনজুর আহমেদও মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণও প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “মাধ্যমিক পর্যায়ে অবশ্যই বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক থাকা দরকার। উপযুক্ত প্রশিক্ষণও দরকার। এগুলো না থাকা একটি বড় রকমের বিচ্যুতি। এগুলো নিয়ে এখনো সঠিক কোনো পরিকল্পনা নেই। এ বিষয়ে বিশেষভাবে জোর দিতে হবে।”
এসএসসির ফলেও ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার চিত্র
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলেও ঢাকার বাইরের কয়েকটি শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকার তুলনায় এসব বোর্ডে দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর হার বেশি।
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে ৩৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং গণিতে ৩০ দশমিক ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। বরিশাল ও সিলেট বোর্ডেও ইংরেজিতে অকৃতকার্যের হার ৩০ শতাংশের বেশি। বরিশালে এ হার ৩০ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং সিলেটে ৩০ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে ইংরেজিতে ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং গণিতে ১৭ দশমিক ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
অন্যদিকে, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে ২৭ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং গণিতে ২৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
ফলাফলের এসব পরিসংখ্যানে ঢাকার তুলনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার চিত্র দেখা যায়। শিক্ষাবিদদের মতে, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। তবে শুধু পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষকসংকটের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ফলাফলের সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায় না।

