মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

নতুন এফডিআই কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ, বিনিয়োগে সতর্ক বিদেশিরা

এপ্রিল-জুনে নতুন এফডিআই কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ; পুনর্বিনিয়োগে মোট নিট বিনিয়োগ বাড়লেও আগের প্রান্তিকের তুলনায় কমেছে ২২ শতাংশ

বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। এর মধ্য দিয়ে টানা দুই প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমল। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং আন্তর্জাতিক ঋণমান নিয়ে উদ্বেগের কারণে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সতর্কতা বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে নতুন বিনিয়োগ কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

এর আগে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছিল ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ফলে পরপর দুই প্রান্তিকে নতুন বিদেশি মূলধনের প্রবাহ কমার চিত্র উঠে এসেছে।

নতুন বিনিয়োগ কমলেও বেড়েছে বার্ষিক নিট প্রবাহ

নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমলেও গত বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় চলতি বছরের এপ্রিল-জুনে মোট নিট বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। নতুন বিনিয়োগ, মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোর আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ—এই তিনটি উপাদান মিলিয়ে আলোচ্য প্রান্তিকে নিট বিদেশি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলারে।

গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। সে হিসাবে এক বছরে নিট বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। তবে আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় এপ্রিল-জুনে নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২২ শতাংশ।

মূলত দেশে আগে থেকে কার্যক্রম চালানো বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে বার্ষিক হিসাবে মোট নিট বিনিয়োগ বেড়েছে। অর্থাৎ, মোট বিনিয়োগ বাড়লেও নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগমন বা নতুন প্রকল্পে মূলধন প্রবাহ বাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত হচ্ছে না।

মুনাফার পুনর্বিনিয়োগে বড় অবদান

বাংলাদেশে আগে থেকেই ব্যবসা করা বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের অর্জিত মুনাফার যে অংশ দেশে রেখে আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করে, তাকে মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ বলা হয়। এ ধরনের বিনিয়োগ বাড়লে মোট বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়তে পারে, যদিও নতুন বিনিয়োগকারী বা নতুন প্রকল্পের সংখ্যা বাড়তেই হবে এমন নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৯১ লাখ ডলারে। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার।

আলোচ্য প্রান্তিকে মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ বাবদ মোট ৬৬ কোটি ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার দেশে এসেছে। বিপরীতে এ খাতে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে ৪০ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ফলে নিট পুনর্বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৯ লাখ ডলারের কিছু বেশি।

এ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, নতুন বিদেশি মূলধন আসার পরিবর্তে দেশে আগে থেকেই ব্যবসা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ সামগ্রিক বিনিয়োগের প্রবাহে বড় ভূমিকা রাখছে।

আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণে বড় পতন

সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের তিনটি প্রধান উপাদানের মধ্যে বিদেশি কোম্পানিগুলোর আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের নিট প্রবাহ সবচেয়ে বেশি কমেছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে নিট ঋণ এসেছে ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলার। আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এর পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এক প্রান্তিকের ব্যবধানে এ খাতে নিট ঋণ কমেছে ৬৭ দশমিক ০৪ শতাংশ।

গত বছরের একই প্রান্তিকে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের নিট প্রবাহ ছিল ৫ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার ডলার। সেই তুলনায় চলতি বছরের এপ্রিল-জুনে তা কমেছে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।

আলোচ্য প্রান্তিকে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ বাবদ মোট ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার দেশে এসেছে। বিপরীতে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে ৩২ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। ফলে এ খাতে নিট বিনিয়োগে খুব সামান্য অর্থ যোগ হয়েছে।

ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ কমার পেছনে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক সংকেত দিচ্ছে। এর ফলে নতুন প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে তাঁরা আরও সতর্ক হচ্ছেন।

বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে। চলতি বছরের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে আসে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধন পর্যাপ্ততার হার ১০ শতাংশ। ব্যাংক খাতের এসব দুর্বলতা বিনিয়োগের পরিবেশ ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

আন্তর্জাতিক ঋণমান নিয়েও চাপ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ঋণমান কয়েক দফা কমিয়েছে বিভিন্ন ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা। অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ওই দেশের ঋণমানকে গুরুত্ব দেন। তাই ঋণমান কমে যাওয়া বা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক পূর্বাভাস বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংক খাতের সংকট এবং অর্থনীতির বিভিন্ন দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের ঋণমানও চাপের মুখে রয়েছে।

তবে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরে মুডিস বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি২’ অপরিবর্তিত রেখে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস স্থিতিশীল করেছে। অন্যদিকে, এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি+’ অপরিবর্তিত রাখলেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস নেতিবাচক করেছে।

নতুন বিনিয়োগ ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ

সামগ্রিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশে আগে থেকে কার্যক্রম চালানো বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ বাড়লেও নতুন বিদেশি মূলধনের প্রবাহ দুর্বল রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের নিট প্রবাহে বড় পতন এবং আগের প্রান্তিকের তুলনায় মোট নিট বিনিয়োগ কমে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করছে।

ব্যাংক খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা, আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি কমানো নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। টেকসই বিনিয়োগ প্রবাহ নিশ্চিত করতে নতুন প্রকল্পে বিদেশি মূলধন আসার পরিবেশ তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন