সাক্ষ্যগ্রহণের সময় প্রসিকিউশনের সঙ্গে বাদানুবাদ, অনুমতি ছাড়া কথা বলায় পলককে সতর্ক করলেন ট্রাইব্যুনাল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে প্রসিকিউশনের উদ্দেশে ‘ভয় পাইছে, ভয় পাইছে’ বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। এ সময় অনুমতি ছাড়া কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলা নিয়ে প্রসিকিউশনের সঙ্গে তাঁর বাদানুবাদ হয়। পরিস্থিতির একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল পলককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘রেগে গেলেন তো, হেরে গেলেন।’ পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন পলক।
রোববার (১১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় দশম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কর্মকর্তা মাহদী আমিন। মামলার দুই আসামি হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
সাক্ষীর জবানবন্দি ঘিরে বাদানুবাদ
সাক্ষ্যগ্রহণের একপর্যায়ে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম সাক্ষী মাহদী আমিনকে একটি প্রশ্ন করেন। বক্তব্যটি ভূতাপেক্ষ কি না, তা জানতে চাইলে প্রথমে সাক্ষী উত্তর দিতে না চাইলেও পরে বলেন, এটি ভূতাপেক্ষ হবে।
এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে পলক প্রসিকিউশনের উদ্দেশে বলেন, ‘এত অধৈর্য হচ্ছেন কেন। এখানে আমার বিচার হচ্ছে। ধৈর্য নিয়ে কথা বলবেন। এখানে সবাই বিচারপ্রার্থী। আমরা আপনার কোনো আদেশ বা কথা শুনতে এখানে আসিনি।’
পলকের এ বক্তব্যের পর প্রসিকিউটর তামিম বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন। তবে কোনো আসামি অনুমতি ছাড়া হঠাৎ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এভাবে কথা বলতে পারেন না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনও তুলে ধরতে চান তিনি।
এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ‘কথায় কথায় আইন দেখাচ্ছেন কেন’ বলে মন্তব্য করেন। এতে আপত্তি জানিয়ে বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের নজরে আনেন প্রসিকিউটর তামিম। তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আসামিপক্ষ কি এ কথা বলেছেন? এটা খুবই আপত্তিকর।’
পরে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, প্রসিকিউশন কোনো বিষয়ে বক্তব্য তুললে আসামি বা তাঁর আইনজীবীরাও আপত্তি জানাতে পারেন। অন্যদিকে, প্রসিকিউটর তামিম বলেন, আদালতে কথা বলতে হলে অনুমতি নিতে হবে। এ সময় আসামিপক্ষ থেকে মন্তব্য করা হয়, প্রসিকিউটর মাঝেমধ্যে ক্ষিপ্ত হয়ে যান।
‘রেগে গেলেন তো, হেরে গেলেন’
বাদানুবাদের একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল পলককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘রেগে গেলেন তো, হেরে গেলেন। তাই কথা বলতে চাইলে অনুমতি নিয়ে বলতে হবে।’
জবাবে পলক বলেন, ‘অযৌক্তিক তো কিছু বলিনি।’ তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘এখানে ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। কেউ কোনো কিছু ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না।’
এরপর আবারও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সাক্ষ্য দেওয়ার একপর্যায়ে মাহদী আমিন জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের প্রসঙ্গ তোলেন।
সাক্ষী জানান, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি কার্যালয়ে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী পলকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে জিয়াউল আহসানকে থ্রিজি ও ফোরজি ইন্টারনেট সেবা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
জবানবন্দির অংশ বাদ দেওয়ার আবেদন
সাক্ষীর এ বক্তব্যের একটি অংশ নিয়ে আপত্তি জানায় প্রসিকিউশন। তাদের বক্তব্য, কথাটি আলোচনার প্রসঙ্গে এলেও মামলার অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। এ কারণে ওই অংশ বাদ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়। সাক্ষীও প্রসিকিউশনের বক্তব্যে সম্মতি দেন।
এ সময় কাঠগড়ায় থাকা পলক আবারও সাক্ষীর উদ্দেশে ‘ভয় পাইছে, ভয় পাইছে’ বলে মন্তব্য করেন। তখন ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বসতে বলে সতর্ক করে বলেন, ‘একটু বসতে পারেন। কথা কম বলেন দয়া করে।’
পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে পলক বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আমি বিনয়ের সঙ্গে অনুমতি চাই। প্রসিকিউটর মহোদয় সাক্ষীকে প্রশ্ন করে জবানবন্দি নিয়েছেন। সেক্ষেত্রে এটা বাদ দিতে হলে হোস্টাইল করতে হবে।’
জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, সারাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক এনটিএমসির নির্দেশনায় বন্ধ করা হয়েছিল—এ বক্তব্য আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে। তবে সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে তিনি জানেন না। ২৮ জুলাইয়ের সভার মাধ্যমে ইন্টারনেট চালুর বিষয়ে জানতে পেরেছেন বলে জানান তিনি।
জয়-পলকের বিরুদ্ধে তিন অভিযোগ
এ মামলায় পলকের পক্ষে আইনি লড়াই করছেন আইনজীবী লিটন আহমেদ। আর পলাতক থাকায় সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে সরকারি খরচে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আইনজীবী মনজুর আলমকে। তাঁরা রোববার ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
প্রসিকিউশনের আনা তিনটি অভিযোগে বলা হয়েছে, জয়ের নির্দেশে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই রাতে ফেসবুকে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ান পলক। এর পরদিন ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইন্টারনেট বন্ধ করে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি ও প্ররোচনা দেওয়া এবং হত্যাকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগও আনা হয়েছে জয় ও পলকের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় রাসেল ও মোসলেহ উদ্দিনসহ ২৮ জন নিহত হন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। পাশাপাশি উত্তরায় ৩৪ জনকে হত্যায় সহায়তার অভিযোগও রয়েছে।
চলছে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার
চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি জয় ও পলকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এর আগে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) আমলে নেন একই ট্রাইব্যুনাল।
মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। রোববারের শুনানিতে সাক্ষীর জবানবন্দি, তা থেকে নির্দিষ্ট অংশ বাদ দেওয়ার আবেদন এবং কাঠগড়ায় পলকের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আদালতে একাধিকবার বাদানুবাদের ঘটনা ঘটে।

