বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের পরিবেশগত সুরক্ষা, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ও চলমান প্রকল্পের পরিধি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ।
এ লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বিজিএমইএর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে পোশাক উৎপাদনে পানির ব্যবহার কমানো, বর্জ্যপানি পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহার, আধুনিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বিশ্বব্যাংক-বিজিএমইএ বৈঠক
আজ রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক মারা কে. ওয়ারউইকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
বিজিএমইএর পক্ষ থেকে আলোচনায় আরও অংশ নেন পরিচালক ড. মো. হাসিব উদ্দিন। বৈঠকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের টেকসই উন্নয়ন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত সুরক্ষায় করণীয় নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব ও মতামত তুলে ধরা হয়।
পানি ব্যবস্থাপনা এখন বাণিজ্য সক্ষমতার অংশ
বৈঠকের শুরুতেই বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পানি ব্যবস্থাপনা এখন শুধু পরিবেশগত বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা, বিশেষ করে ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো, পোশাক উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে পানির ব্যবহার কমানো, বর্জ্যপানি পরিশোধন এবং পানি পুনর্ব্যবহারের তথ্যকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে।
এ কারণে একদিকে ঢাকার নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সুরক্ষা এবং অন্যদিকে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বাজার ধরে রাখতে পানি সাশ্রয়ী ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম পর্যালোচনা
বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ‘ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’ নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়নাধীন ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ভিজিএফ পাইলট প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়।
প্রকল্পের আওতায় বিজিএমইএর পক্ষ থেকে ৩১টি পোশাক কারখানার একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর মধ্য থেকে বিশ্বব্যাংক আটটি কারখানাকে নিয়ে কাজ শুরু করবে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
তহবিল ও প্রকল্পের পরিধি বাড়ানোর আহ্বান
তবে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রতি দেশের পোশাক কারখানাগুলোর ব্যাপক আগ্রহ এবং বিদ্যমান চাহিদার তুলনায় ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিল ও আটটি কারখানাকে নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিধি যথেষ্ট নয় বলে বৈঠকে তুলে ধরা হয়।
এই বাস্তবতায় বিজিএমইএ সভাপতি প্রকল্পটির তহবিল বৃদ্ধি এবং এর সামগ্রিক পরিধি আরও বড় করার জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
তিনি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সবুজ রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে আরও বেশি কারখানাকে প্রকল্পের আওতায় আনা এবং টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন।
সবুজ রূপান্তরে সহযোগিতার আশ্বাস
বৈঠক শেষে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দল বিজিএমইএর পক্ষ থেকে উপস্থাপিত প্রস্তাবগুলোকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সবুজ রূপান্তরকে আরও ত্বরান্বিত করতে লজিস্টিকস ও সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে তারা আশ্বাস দেন।
বৈঠকে পরিবেশগত সুরক্ষা ও পানি ব্যবস্থাপনায় পোশাকশিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত পরিবেশগত ও টেকসই উৎপাদনসংক্রান্ত চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পকে আরও কার্যকরভাবে খাপ খাওয়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলে যারা ছিলেন
বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন লিড ওয়াটার স্পেশালিস্ট ডেভিড মেলকম লর্ড, সিনিয়র ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন স্পেশালিস্ট রোকেয়া আহমেদ, ওয়াটার স্পেশালিস্ট মো. মাহাদী হাসান এবং এনভায়রনমেন্টাল স্পেশালিস্ট বুশরা নিশাত।
বৈঠকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের টেকসই ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের ক্ষেত্রে পানি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

