অনুসরণ করুন:
বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

ঋণ বাড়ছে, আয় বাড়ছে না পিজিসিবির; সরকারের আর্থিক ঝুঁকি ঘনীভূত

দেশি-বিদেশি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়লেও সেই তুলনায় পর্যাপ্ত আয় করতে পারছে না দেশের একমাত্র বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)। ফলে বাড়ছে সংস্থাটির পরিচালন ঘাটতি, সঞ্চিত লোকসান ও আর্থিক দায়। দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে বিপুল ঋণ নিয়ে সঞ্চালন লাইন, সাবস্টেশন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপন করা হলেও এসব বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত হারে আয় বাড়ছে না।

পিজিসিবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পটুয়াখালী-গোপালগঞ্জ, আমিনবাজার-গোপালগঞ্জ, দিনাজপুর ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে দেশি-বিদেশি ঋণের অর্থে। বর্তমানে সঞ্চালন লাইন ও অবকাঠামো উন্নয়নে পিজিসিবির ১৪টি প্রকল্প চলমান। এসব প্রকল্পে দেশি-বিদেশি ঋণ মিলিয়ে প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।

ফলে একদিকে দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারিত হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণের বোঝা ও আর্থিক দায়ও বাড়ছে। সব মিলিয়ে সরকারের জন্য পিজিসিবির আর্থিক দায় ও ঝুঁকি ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

দ্রুত বাড়ছে ঋণের বোঝা

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পিজিসিবির ঋণের বোঝা গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে সংস্থাটির মোট ঋণ ছিল ৩০ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। ওই সময়ে সংরক্ষিত আয়ের উদ্বৃত্ত ছিল ৭৩৭ কোটি টাকা।

২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা। একই সময়ে সংরক্ষিত আয় ঋণাত্মক হয়ে সংরক্ষিত লোকসান দাঁড়ায় ৬৪৮ কোটি টাকা।

পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ শেষে পিজিসিবির ঋণ আরও বেড়ে ৪৯ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছে। একই সময়ে সংরক্ষিত লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা।

২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা এবং সংরক্ষিত লোকসান বেড়ে হয় ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা।

সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত পিজিসিবির ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা। ওই সময়ে সংরক্ষিত লোকসান অবশ্য কমে ৯২১ কোটি টাকায় নেমেছে।

সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে পিজিসিবির ঋণ দ্রুত বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ঝুঁকিও মাঝারি পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে কোম্পানিটির মোট দায় প্রায় ৫৬ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা দাঁড়ায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৩০ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি।

পিজিসিবির মোট ঋণের প্রায় ৮৯ শতাংশই সরকারের সঙ্গে করা সাবসিডিয়ারি লোন অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএলএ) ও লোন অ্যাগ্রিমেন্ট (এলএ)-এর আওতায় নেওয়া হয়েছে।

সঞ্চালন ট্যারিফ বাড়লেও আয় বাড়ছে না

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ দেশের একমাত্র বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংস্থা হিসেবে ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত সংস্থাটির সঞ্চালন ট্যারিফ পাঁচবার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ তিনবার এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দুবার ট্যারিফ নির্ধারণ করেছে।

সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সঞ্চালন ট্যারিফ বাড়ানোর পর সর্বশেষ চলতি বছরের জুনেও তা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার প্রায় পুরোটা পিজিসিবির ওপর নির্ভরশীল।

তবে সংস্থাটির ব্যয় দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য কার্যকর প্রতিযোগিতামূলক বেঞ্চমার্ক না থাকায় পূর্ণ কস্ট রিকভারি নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পিজিসিবি যদি পূর্ণ ব্যয় আদায় করতে না পারে, তাহলে ধারাবাহিক লোকসান তৈরি হবে। আর সেই ঘাটতি শেষ পর্যন্ত সরকারকেই ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করতে হবে।

কিন্তু সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ভর্তুকির অর্থ ঋণ হিসেবে হিসাবভুক্ত হওয়ায় পিজিসিবির ওপর ধীরে ধীরে ঋণের বোঝা জমছে। ফলে সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সংস্থাটির আর্থিক চাপও বাড়ছে।

সরকারি অর্থের ৬০ শতাংশ ইকুইটি, ৪০ শতাংশ ঋণ

সূত্র আরও জানায়, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পিজিসিবি প্রতিবছর সরকারের কাছ থেকে অর্থ নেয়। সরকারের কাছ থেকে নেওয়া ওই অর্থের ৬০ শতাংশ ইকুইটি এবং ৪০ শতাংশ ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইকুইটি হিসেবে নেওয়া অর্থ কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে ডিপোজিটের পর শেয়ার হিসেবে দেখানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডিপোজিট ফর শেয়ারের অর্থের বিপরীতে সরকারের অনুকূলে শেয়ার ইস্যু করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে বিনিয়োগকারীদের মুনাফার অংশ হিসেবে লভ্যাংশ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ফলে কোম্পানির আয় ও মুনাফায় ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়নে ধীরগতির কারণে প্রত্যাশিত হারে পিজিসিবির আয় ও মুনাফা বাড়ছে না।

অন্যদিকে প্রতি বছর বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সরকার থেকে বিপুল অর্থ ইকুইটি হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। এর বিপরীতে পিজিসিবিকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ারও ইস্যু করতে হচ্ছে। এতে সংস্থাটির আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সঞ্চালন না হওয়ায় আয় ঘাটতি

পিজিসিবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় অঙ্কের অবকাঠামো বিনিয়োগের বিপরীতে সংস্থাটির সঞ্চালন আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। মূলত নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সঞ্চালন না হওয়ায় আয় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কোম্পানির লোকসানে।

অনেক ক্ষেত্রে সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণের পরও তা পর্যাপ্তভাবে ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু ওই অবকাঠামোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় পিজিসিবিকে বহন করতে হচ্ছে।

গত কয়েক বছরে বিপিডিবির গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকেও প্রত্যাশিত পরিমাণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন হয়নি। ফলে দূরবর্তী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ক্ষেত্রে ট্রান্সমিশন লস বেড়েছে। এতে একদিকে সঞ্চালন আয় কমেছে, অন্যদিকে অবকাঠামোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অব্যাহত থেকেছে।

হুইলিং চার্জ ও ডলারের বিনিময় হার বড় চাপ

পিজিসিবির আয়ের প্রধান উৎস হুইলিং বা সঞ্চালন চার্জ। এই চার্জের মাধ্যমেই সংস্থাটির পরিচালন ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়নসহ সামগ্রিক ব্যয় নির্বাহ করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গত কয়েক বছরে হুইলিং চার্জ বাড়ানো হয়নি। একই সময়ে বছরভিত্তিক যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সঞ্চালনের প্রাক্কলন করা হয়েছিল, তাও পূরণ হয়নি। ফলে ব্যয় বাড়লেও আয় সে অনুযায়ী বাড়েনি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত ক্ষতি। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে পিজিসিবির ৩ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ থাকায় ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার পরিবর্তনের চাপ সরাসরি কোম্পানির আর্থিক অবস্থায় পড়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি পিজিসিবির আর্থিক চাপ বাড়ানোর অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

রাষ্ট্রের ওপরও বাড়ছে আর্থিক দায়

সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ, নির্ধারিত সঞ্চালন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া, হুইলিং চার্জের তুলনামূলক ধীর সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত ক্ষতি এবং পূর্ণ কস্ট রিকভারি না হওয়ার কারণে পিজিসিবির আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

এর পাশাপাশি সরকারের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের বড় অংশ ঋণ হিসেবে হিসাবভুক্ত হওয়ায় পিজিসিবির দায় বাড়ছে। আর এই দায়ের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের আর্থিক দায়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এ কারণে বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি পিজিসিবির আর্থিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস, পূর্ণ কস্ট রিকভারি নিশ্চিত করা এবং সরকারের অর্থায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পর্ষদেও উদ্বেগ, নেওয়া হচ্ছে পরিকল্পনা

এ প্রসঙ্গে পাওয়ার গ্রিডের পর্ষদে পরিচালক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী জানান, পাওয়ার গ্রিডের বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ রয়েছে। ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়েছে।

তিনি বলেন, মুদ্রার অবমূল্যায়নজনিত এই ঝুঁকি প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে পাওয়ার গ্রিডের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে পর্ষদেও উদ্বেগ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটিকে এ অবস্থা থেকে বের করে আনতে পর্ষদে আলোচনার পাশাপাশি কিছু পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

আর্থিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের তাগিদ

পিজিসিবির আর্থিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সংস্থাটির আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিপুল ঋণ নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণের পর তা থেকে প্রত্যাশিত আয় না এলে ঋণ পরিশোধ ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পূর্ণ কস্ট রিকভারি নিশ্চিত করা, সঞ্চালন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার, বাস্তবসম্মত সঞ্চালন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, হুইলিং চার্জ সময়োপযোগী সমন্বয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সরকারের অর্থায়ন কাঠামো পুনর্বিবেচনা জরুরি।

অন্যথায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে পিজিসিবির আর্থিক দায়ও বাড়তে থাকবে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা ও পুঁজিবাজার—উভয় ক্ষেত্রেই পড়তে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন