নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং কার্বন নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘রামপাল ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প’ নামে প্রস্তাবিত প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা।
আগামীকাল বুধবার একনেক চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ প্রকল্পটির প্রস্তাব করেছে এবং এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অর্থায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিলের ঋণের বার্ষিক সুদের হার হবে ২ শতাংশ। এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ পরিশোধের সময় থাকবে ১৬ বছর।
জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ৪৪২ মেগাওয়াট
বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্যানেল ক্ষমতা হবে ৪৪২ মেগাওয়াট। সৌর প্যানেলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ইনভার্টারের মাধ্যমে এসি বিদ্যুতে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এটি দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। নতুন এই প্রকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সহায়তা করবে।
পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে নতুন করে ৪৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। বর্তমানে দেশে মোট ২৮ হাজার ৮২৭ মেগাওয়াট অন-গ্রিড বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে সৌরবিদ্যুতের অবদান ৭৯৭ মেগাওয়াট।
৯১৮ একর জমিতে হবে প্রকল্প
প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি রামপালের ‘ব্লক-বি’ এলাকায় ৯১৮ দশমিক ৫০ একর জমিতে নির্মাণ করা হবে। এই জমি আগে থেকেই বিপিডিবির মালিকানাধীন এবং নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। ফলে প্রকল্পের ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম রাখা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১২ সালে রামপালে মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল বিপিডিবি। এর মধ্যে ব্লক-এতে রয়েছে ৯১৫ দশমিক ৫০ একর এবং ব্লক-বিতে ৯১৮ দশমিক ৫০ একর জমি।
ব্লক-এতে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেডের ‘মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট’ নির্মাণ করা হয়েছে। অপরদিকে ব্লক-বি বিপিডিবির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রকল্প দলিল অনুযায়ী, ব্লক-বিতে ভূমি উন্নয়ন ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
বিদ্যমান সঞ্চালন লাইনেই গ্রিডে যাবে বিদ্যুৎ
প্রকল্পের একটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কাছেই থাকা রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যমান সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
প্রকল্প সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, বিদ্যমান সঞ্চালন অবকাঠামো ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় নতুন করে বড় ধরনের সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। এতে প্রকল্পটি তুলনামূলক কম ব্যয়ে এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
প্রস্তাবিত কেন্দ্রে সর্বনিম্ন ৬৪০ ওয়াট-পিক ক্ষমতার সৌর ফটোভোলটাইক মডিউল স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি ৩৬০ মেগাওয়াট মোট ক্ষমতার গ্রিড-টাইড ইনভার্টার, একটি পুলিং সাবস্টেশন, তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ডাবল-সার্কিট ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন এবং একটি স্পেয়ার বে-সহ তিনটি ২৩০ কেভি বে নির্মাণ করা হবে।
মডিউল ও সরঞ্জামেই বড় ব্যয়
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় হবে সৌর ফটোভোলটাইক মডিউল ও মাউন্টিং স্ট্রাকচার কেনায়। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ২৩৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক।
এ ছাড়া ইনভার্টার, ট্রান্সফরমার এবং সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডাটা অ্যাকুইজিশন (SCADA) সিস্টেমসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ৭৩২ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে বাস্তবায়নের সুপারিশ
পরিকল্পনা কমিশন ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ আরও বাড়বে বলে মনে করছে কমিশন।
পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট জ্বালানি কাঠামোর ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে উৎপাদনের যে লক্ষ্য রয়েছে, তা অর্জনে প্রকল্পটি সহায়ক হবে। পাশাপাশি প্রাথমিক জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য আসায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং কার্বন নির্গমন কমবে।
কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকল্পটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
নির্মাণ ও পরিচালনায় কর্মসংস্থান
প্রকল্পটি বাস্তবায়নকালে প্রকল্প কার্যালয়ে ২৫ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে প্রায় ২০০ জন সাময়িক শ্রমিক কাজ করার সুযোগ পাবেন।
কেন্দ্রটি নির্মাণের পর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ২৬১ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর মধ্যে ৫১ জন স্থায়ীভাবে এবং ২০৩ জন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাবেন।
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে প্রকল্প গ্রহণযোগ্য
প্রকল্পের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। যাচাই শেষে প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পটিকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অননুমোদিত ‘সবুজ পাতা’ প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সুপারিশ এবং পরবর্তীতে বাস্তবায়নের সময়সীমা কমানোর সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যুৎ বিভাগের মূল প্রস্তাবের তুলনায় প্রকল্পের ব্যয় ৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা কমেছে।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, আর্থিক ও অর্থনৈতিক—উভয় বিবেচনায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নযোগ্য। কমিশন প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করেছে।
প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি ‘সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামো’ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৭ নম্বর লক্ষ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসডিজি-৭ এর মূল লক্ষ্য হলো সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করা।
একনেকের অনুমোদন পেলে রামপালের এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন।

