মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবেলায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণে সরকারের উদ্যোগ

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও ক্রমবর্ধমান গ্যাস সংকট মোকাবেলায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে কক্সবাজারের মাতারবাড়ী ও পটুয়াখালীর পায়রায় মোট ২ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প দুটিতে ব্যয় হতে পারে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি।

বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণে প্রায় ১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে গ্যাস ও এলএনজির অনিশ্চয়তা এবং তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনামূলক বেশি ব্যয়ের কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকে নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

গ্যাস সংকটে কয়লার দিকে ঝুঁকছে সরকার

সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে জ্বালানি সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির কারণে গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানিতে বাড়ছে ব্যয় এবং ধারাবাহিকভাবে কমছে দেশীয় গ্যাসের মজুদ।

এর বিপরীতে কয়লার আন্তর্জাতিক সরবরাহ ও দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাকে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাড়ানো হলে গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

তবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব, কৃষিজমি, বসতি ও পুনর্বাসনের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কয়লাভিত্তিক সক্ষমতা বাড়বে ৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি

বর্তমানে দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৬ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াট। নতুন দুটি কেন্দ্র যুক্ত হলে এ সক্ষমতা বেড়ে প্রায় ৯ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াটে দাঁড়াবে।

দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পরিচালনায় বছরে প্রায় ২ কোটি টন কয়লার প্রয়োজন হয়। এর বড় একটি অংশ ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হয়। নতুন দুটি কেন্দ্র চালু হলে কয়লার চাহিদা আরও বাড়বে। ফলে আমদানির পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে কয়লা সংগ্রহের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

দেশীয় কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ

সরকার দিনাজপুরের ফুলবাড়ী থেকে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি বড়পুকুরিয়ায় নতুন করে প্রায় ৩০০ একর এলাকায় কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে বোরহোল করার প্রস্তুতিও চলছে।

এ ছাড়া জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ ও রংপুরের খালাশপীর এলাকায় কয়লার মজুদ রয়েছে। তবে সামাজিক ও অন্যান্য কারণে এসব এলাকায় কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রেও সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও জমি অধিগ্রহণকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবেশ, কৃষি, বসতি, পুনর্বাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাতারবাড়ী সম্প্রসারণে ১.৫৬ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প

সূত্র জানায়, মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণ প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল)। এতে প্রায় ১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাড়তি ব্যয়ের কারণে প্রকল্পটিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো থাকায় সুবিধা

বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, জ্বালানি সরবরাহের সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তার কারণে গ্রিড-সংযুক্ত নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ কারণে আরও দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, মাতারবাড়ীতে আগে থেকেই বিদ্যুৎ সঞ্চালনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকায় নতুন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য স্থানটি বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির প্রথম ইউনিট প্রায় তিন বছরের মধ্যে এবং দ্বিতীয় ইউনিট প্রায় চার বছরের মধ্যে উৎপাদনে আসতে পারে।

বিদেশি অর্থায়ন পাওয়া না গেলে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

কয়লার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও গুরুত্ব

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারি পরিকল্পনায় বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টিও রয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৮৫২ দশমিক ০৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্রিডভিত্তিক সক্ষমতা ১ হাজার ৪৭৩ দশমিক ০৫ মেগাওয়াট এবং অফ-গ্রিড সক্ষমতা ৩৭৮ দশমিক ৫৬ মেগাওয়াট।

ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাৎক্ষণিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন