দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে হামলার অভিযোগ • সরকারি EPI টিকা-নথিসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম লুটের দাবি • ভারী যন্ত্রে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা স্থাপনা ভাঙা • মামলা, আসামি ২০০–২৫০ অজ্ঞাতসহ একজন নামীয়
প্রায় পাঁচ দশক ধরে মিরপুরের নিম্ন আয়ের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা একটি কেন্দ্র। যেখানে শিশুদের টিকাদান থেকে শুরু করে মাতৃস্বাস্থ্য, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়া হতো। সেই রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার এখন ধ্বংসস্তূপ।
রাজধানীর মিরপুর-১-এ বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত মধ্যরাতে একদল লোক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে এবং পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে কেন্দ্রটির স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে রাড্ডা কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলায় মো. হানিফ মিয়াকে নামীয় আসামি করা হয়েছে; পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মধ্যরাতে কী ঘটেছিল?
রাড্ডা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ১২টার দিকে বিপুলসংখ্যক লোক কেন্দ্রটিতে প্রবেশ করে। তাদের অনেকের মুখ ঢাকা ছিল এবং কারও কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল বলে অভিযোগ।
প্রথমে দায়িত্বে থাকা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করা হয়। এরপর কেন্দ্রের বিভিন্ন কক্ষে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলাকারীরা সরকারি EPI টিকা, টিকাদানের রেজিস্টার ও অন্যান্য নথি, পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, সিসিটিভি সরঞ্জাম, ফ্রিজ, এসি, জেনারেটর ও আসবাবপত্র নিয়ে যায়।
একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনও লুট হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৪৫ লাখ টাকা।
নগদ প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সব মিলিয়ে লুটপাট ও ধ্বংসে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি রাড্ডা কর্তৃপক্ষের।
তারপর ভারী যন্ত্র দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় স্থাপনা
শুধু লুটপাটেই ঘটনা থামেনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, এরপর ভারী যন্ত্রপাতি এনে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়।
ঘটনার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নামে একটি সাইনবোর্ড দেখা যায়।
সাইনবোর্ডে দাবি করা হয়েছে, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে বরাদ্দ ও রেজিস্ট্রিমূলে ওই প্লটের মালিক সমিতিটি।
অন্যদিকে রাড্ডা কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রায় ১০ কাঠার এই জায়গা দখলের চেষ্টা কয়েক বছর ধরেই চলছিল। ২০২২ সালেও জায়গাটি দখলের চেষ্টা হয়েছিল বলে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক অভিযোগ করেছেন।
ফলে এটি নিছক ভাঙচুর বা লুটপাট, নাকি জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে পরিকল্পিত দখল—সেই প্রশ্ন এখন তদন্তের কেন্দ্রে।
মামলা হয়েছে, তদন্তে পুলিশ
ঘটনার পর শাহ আলী থানায় মামলা হয়েছে।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, মামলায় মো. হানিফ মিয়াকে নামীয় আসামি এবং ২০০ থেকে ২৫০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগের মধ্যে অনধিকার প্রবেশ, চুরি, হুমকি এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয় রয়েছে।
পুলিশ বলছে, তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নামীয় আসামি হানিফ মিয়ার অস্বীকার
ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি নেতা মো. হানিফ মিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে এবং তাঁকে মামলায় নামীয় আসামি করা হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে হানিফ মিয়া বলেছেন, তিনি এ ঘটনায় জড়িত নন এবং সেখানে কী ঘটেছে, সেটিও তাঁর জানা নেই। মামলায় তাঁর নাম কেন এসেছে, সে বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনো অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে; এর সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
১৯৭৪ সালে শুরু, সেবা প্রায় পাঁচ দশকের
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে তৎকালীন সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেন—Rädda Barnen—মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার প্রকল্প হিসেবে কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু করে।
প্রথম দুই দশক Rädda Barnen কেন্দ্রটি পরিচালনা ও অর্থায়ন করে। ১৯৯৪ সালে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতিক্রমে কেন্দ্রটির পরিচালনার দায়িত্ব স্থানীয় ব্যবস্থাপনার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বর্তমানে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের Facility Registry-তেও Radda MCH-FP Centre-Mirpur একটি NGO Hospital/Clinic হিসেবে তালিকাভুক্ত।
প্রতিষ্ঠানটি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা, পরিবার পরিকল্পনা, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং শিশুদের টিকাদানসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল।
কর্তৃপক্ষের হিসাবে, প্রতিদিন গড়ে চার শতাধিক মানুষ কেন্দ্রটির বিভিন্ন সেবা নিতেন।
টিকাদান কার্যক্রমেও আঘাত
ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো টিকাদান কার্যক্রম।
রাড্ডা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, সরকারি EPI কর্মসূচির টিকা এবং টিকাদানসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্টার ও নথিও হামলার সময় নিয়ে যাওয়া হয়েছে বা নষ্ট হয়েছে।
ফলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভবন বা সম্পত্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি—স্থানীয় মা ও শিশুদের দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
প্রশ্নটা শুধু ১০ কাঠা জমির নয়
জমিটির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে তার নিষ্পত্তির জন্য আদালত ও রাষ্ট্রীয় আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে।
কিন্তু রাজধানীর একটি জনবহুল এলাকায় মধ্যরাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে ভারী যন্ত্র ব্যবহার করে একটি চালু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
এত মানুষ কীভাবে মধ্যরাতে সেখানে জড়ো হলো? ভারী যন্ত্রপাতি কীভাবে আনা হলো? একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা স্থাপনা ভাঙতে যে সময় লেগেছে, সেই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর হস্তক্ষেপ কেন দেখা গেল না?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সরকারি টিকাদান কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওষুধ, টিকা ও নথি যদি সত্যিই লুট হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো উদ্ধারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছ থেকেও প্রয়োজন।
কারণ বিরোধটি শুধু ১০ কাঠা জমির মালিকানা নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মিরপুরের হাজারো নিম্ন আয়ের পরিবারের প্রায় ৫০ বছরের স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশুদের টিকাদানের অধিকার।

