শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘে বিরল পারিবারিক ইতিহাস: জিয়া-খালেদার পর বিশ্বমঞ্চে তারেক রহমান

বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিলেন তারেক রহমান • প্রথম ভাষণেই বাংলায় তুলে ধরলেন বাংলাদেশের অগ্রাধিকার • চার দশকের বেশি সময়ের পারিবারিক যোগসূত্রে নতুন অধ্যায়

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিরল পারিবারিক ধারাবাহিকতায় যুক্ত হলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পর একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিলেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের প্রথম ভাষণ দেন তারেক রহমান। সম্পূর্ণ বাংলায় দেওয়া বক্তব্যে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পাশাপাশি বিশ্বশান্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু তুলে ধরেন তিনি।

বিশ্বমঞ্চে বাবা-মাকে স্মরণ

জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের প্রথম ভাষণে বাবা-মায়ের স্মৃতিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্মরণ করেন, তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান এবং মা খালেদা জিয়াও একই বিশ্বমঞ্চ থেকে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন।

সেই ধারাবাহিকতায় এবার বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থার প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার কথা বলেন তারেক রহমান।

জাতিসংঘের সরকারি নথি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন। ওই অধিবেশনটি মূলত নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

সেদিনের ভাষণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংকট, ধনী ও দরিদ্র রাষ্ট্রের মধ্যকার বৈষম্য এবং একটি ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন জিয়াউর রহমান।

১৩ বছর পর একই মঞ্চে খালেদা জিয়া

জিয়াউর রহমানের ভাষণের ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন সাধারণ অধিবেশন ও জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি।

১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ স্মারক অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার বক্তব্যের নথিও জাতিসংঘের আর্কাইভে রয়েছে। সেখানে জাতিসংঘ সংস্কার, আন্তর্জাতিক আইনের শাসন এবং ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছিলেন তিনি।

এরপর চার দশকের বেশি সময় আগে জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে শুরু হওয়া পারিবারিক যোগসূত্রে এবার নতুন অধ্যায় যোগ করলেন তাঁদের ছেলে তারেক রহমান।

বাংলায় প্রথম ভাষণ

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এটি তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ। তিনি বক্তব্য দেন বাংলায়।

ভাষণে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকট নিয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পায়।

এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছিলেন, তারেক রহমানের এবারের জাতিসংঘ সফরের একটি বিশেষ দিক হলো—জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পর একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

ইতিহাসের দাবি নিয়ে সতর্কতা

তারেক রহমানের ভাষণকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে এটিকে জাতিসংঘের ইতিহাসে একই পরিবারের বাবা, মা ও ছেলের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে ভাষণ দেওয়ার প্রথম ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

তবে জাতিসংঘের প্রকাশ্য নথিতে এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক তালিকা পাওয়া যায় না, যার ভিত্তিতে ‘বিশ্বে প্রথম’ দাবিটি নিশ্চিতভাবে যাচাই করা যায়। ভারতেও নেহরু-গান্ধী পরিবারের জওহরলাল নেহরু, তাঁর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী এবং নাতি রাজীব গান্ধীর জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার নজির রয়েছে বলে ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার ঘটনাটি একই পরিবারের তিন সদস্যের বিরল পারিবারিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখযোগ্য।

১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান থেকে ২০২৬ সালে তারেক রহমান—৪৬ বছরের ব্যবধানে একই পরিবারের তিন সদস্যের জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার মধ্য দিয়ে সেই ধারাবাহিকতায় এবার নতুন অধ্যায় যুক্ত হলো।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন