শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘে প্রথম ভাষণে তারেক রহমান: ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট, বাংলাদেশ ফর অল’

বাংলায় দেওয়া ভাষণে বিশ্বশান্তি, ফিলিস্তিন ও রোহিঙ্গা সংকট থেকে জলবায়ু ন্যায়বিচার—বিস্তৃত বার্তা • তুলে ধরলেন সরকারের ‘থ্রি-আর’ কৌশল ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা • ২৫ কোটি গাছ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা বিশ্বমঞ্চে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | নিউইয়র্ক, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন তারেক রহমান। বিশ্বশান্তি ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা থেকে শুরু করে ফিলিস্তিন ও রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান, নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা এবং প্রযুক্তি—বিস্তৃত বিষয় উঠে এসেছে তাঁর ভাষণে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদ হলে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেন।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৬ মিনিটে তিনি বাংলায় ভাষণ শুরু করেন এবং শেষ করেন সন্ধ্যা ৬টা ৩৭ মিনিটে।

বিশ্বমঞ্চে বাবা-মাকে স্মরণ

ভাষণের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণ করেন তিনি।

জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জাতিসংঘে ভাষণের কথাও স্মরণ করেন তারেক রহমান।

তিনি বলেন, একই বিশ্বমঞ্চে তাঁর বাবা ও মা বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেছেন; এবার তিনিও দেশের জনগণের স্বার্থ এবং একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থার প্রত্যাশা নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়েছেন।

জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং খালেদা জিয়া প্রথমবার ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন। এর মধ্য দিয়ে তারেক রহমান তাঁদের পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিলেন।

যুদ্ধ নয়, সংলাপ ও কূটনীতিতে সমাধানের আহ্বান

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে কোনো অঞ্চলের সংকট শুধু সেই অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। যুদ্ধ ও সংঘাত মানুষের বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা এবং মূল্যস্ফীতিসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশ সংলাপ, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধানে বিশ্বাস করে বলে জানান তিনি। রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতাকে বিশ্বশান্তির পথে বাধা হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকারে সমর্থন

ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্ভোগ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের উদ্যোগেও বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনই সমাধান

রোহিঙ্গা সংকটকে ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেন তারেক রহমান।

তিনি বলেন, নয় বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ১২ লাখের বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং এর স্থায়ী সমাধানও সেখানেই—এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাওয়াই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান।

প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অর্থায়নের দাবি

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব দেশটিকে ব্যাপকভাবে বহন করতে হচ্ছে বলে ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি COP31 সামনে রেখে জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

এর আগে একই দিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও দ্রুত বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছিলেন তারেক রহমান।

২৫ কোটি গাছ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল

দেশের পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায় সরকারের কয়েকটি বড় পরিকল্পনাও জাতিসংঘের মঞ্চে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচির কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে বন্যা ও খরার প্রভাব মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর কথাও তাঁর ভাষণে উঠে আসে। সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ বাড়ানো, পানি সংরক্ষণ এবং আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও কথা বলেন তিনি।

অর্থনীতি পুনর্গঠনে ‘থ্রি-আর’ কৌশল

দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে সরকারের ‘থ্রি-আর’—Recovery, Restoration and Reconstruction কৌশলের কথা বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর এবং বাংলাদেশকে একটি উৎপাদনকেন্দ্র বা ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের স্টার্টআপ উদ্যোগে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ রাখার কথাও ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

নারীর ক্ষমতায়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড’

দেশের অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠী নারী উল্লেখ করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন তারেক রহমান।

পরিবারের নারীপ্রধানের নামে দেওয়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি উপকরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে ভবিষ্যতে এসব ব্যবস্থাকে সমন্বিত করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

পাঁচ বছরে শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকারের বিশেষ অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। কর্মমুখী ও ব্যবহারিক শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের স্কুলব্যাগ, পোশাক এবং বিনামূল্যে মধ্যাহ্নভোজ দেওয়ার কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন।

খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রমে খেলাধুলাকে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও তাঁর ভাষণে উঠে আসে।

প্রযুক্তির সুযোগ সবার কাছে পৌঁছানোর আহ্বান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতির প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির সুযোগ এখনো বিশ্বে সমানভাবে সবার কাছে পৌঁছায়নি।

বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতাকে সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণায় সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

শেষ বার্তা—‘বাংলাদেশ ফার্স্ট: বাংলাদেশ ফর অল’

ভাষণের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য তুলে ধরেন।

তিনি এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশার কথা বলেন, যেখানে তরুণেরা বাধাহীনভাবে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবেন এবং প্রতিটি শিশু নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।

এই লক্ষ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে বলেন—“বাংলাদেশ ফার্স্ট: বাংলাদেশ ফর অল।”

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে নিজের প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণ শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন