এক চালানেই ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত • কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হতে পারত ৪৩ কোটির বেশি সিগারেট • মাঝারি শ্রেণিতে সম্ভাব্য রাজস্ব সংশ্লিষ্টতা প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা • উচ্চ শ্রেণিতে তা প্রায় ৫৬৪ কোটি টাকা • আরও চার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে সিগারেটের ফিল্টার তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ‘সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো’ আমদানি এবং পরে তা অবৈধভাবে বিক্রি বা হস্তান্তরের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের সরকারি রাজস্ব ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাব্য চিত্র পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)।
সিআইসির ঝুঁকিভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ ও হস্তক্ষেপের পর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে আটকে দেওয়া একটি চালান থেকে আমদানি পর্যায়ে ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হয়েছে। একই চালানের কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত হলে মাঝারি শ্রেণির সিগারেটের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকার রাজস্ব সংশ্লিষ্ট হতে পারত বলে প্রাথমিক হিসাব করেছে সংস্থাটি।
বুধবার এনবিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
অস্বাভাবিক আমদানি থেকেই অনুসন্ধান
সিগারেটের ফিল্টার তৈরির অন্যতম প্রধান উপকরণ সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো দেশে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। সম্প্রতি বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মাধ্যমে পণ্যটির আমদানি অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকায় এর প্রকৃত ব্যবহার, আমদানির পর সরবরাহের গন্তব্য এবং চূড়ান্ত ব্যবহারকারীদের বিষয়ে তথ্য বিশ্লেষণ শুরু করে সিআইসি।
এ অনুসন্ধানেই ইউনিক ট্রেডার্স, বিআইএন ০০৭৫২২৮০১-০২০২-এর আমদানি কার্যক্রম সিআইসির নজরে আসে।
আমদানির পর প্রতিষ্ঠানটি অ্যাসিটেট টো কোথায় সরবরাহ করছে তা জানতে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগের কাছে তথ্য চাওয়া হয়। ভ্যাট বিভাগের যাচাইয়ে দেখা যায়, নিবন্ধিত ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানটির বাস্তব কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই। নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন ও প্রয়োজনীয় দলিলপত্রও দাখিল করা হচ্ছিল না। এ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটিকে অস্তিত্বহীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
দুই কনটেইনারে ৪৮ হাজার কেজির বেশি কাঁচামাল
সিআইসির তথ্যমতে, ইউনিক ট্রেডার্স চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মাধ্যমে ১৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখের বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-১২০৪৭১০-এর আওতায় দুই কনটেইনারে মোট ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো আমদানি করে।
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটির বাস্তব অস্তিত্ব না থাকার তথ্য পাওয়ার পর সরকারের রাজস্ব সুরক্ষায় চালানটির খালাস স্থগিত করা হয়। পরবর্তী প্রক্রিয়ায় ওই চালানের বিপরীতে আমদানি পর্যায়ের ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে অনুসন্ধানে শুধু আমদানি পর্যায়ের রাজস্ব নয়, পণ্যটির স্থানীয় ব্যবহারের সঙ্গে আরও বড় অঙ্কের সম্ভাব্য রাজস্ব সংশ্লিষ্টতার তথ্য সামনে এসেছে।
তৈরি হতে পারত ৪৩ কোটির বেশি সিগারেট
সিগারেট উৎপাদনকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের মূসক-৪.৩-এ ঘোষিত উপকরণ-উৎপাদ সহগ পর্যালোচনা করে সিআইসি হিসাব করেছে, প্রতি এক কেজি অ্যাসিটেট টো ব্যবহার করে প্রায় ৮ হাজার ৯৩৭ শলাকা সিগারেট উৎপাদন সম্ভব।
সে হিসাবে আটক চালানের ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি কাঁচামাল ব্যবহার করে প্রায় ৪৩ কোটি ২ লাখ ৫৪ হাজার শলাকা সিগারেট তৈরি করা সম্ভব হতো।
প্রতি প্যাকেটে ১০ শলাকা ধরে এই পরিমাণ কাঁচামাল দিয়ে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ ২৫ হাজার প্যাকেট সিগারেট উৎপাদন করা যেত।
রাজস্ব সংশ্লিষ্টতা ৩২৪ কোটি থেকে ৫৬৪ কোটি টাকা
এনবিআরের প্রাথমিক হিসাবে, মাঝারি শ্রেণির প্রতি প্যাকেট সিগারেটের খুচরা মূল্য ৯২ টাকা এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূসক ও সম্পূরক শুল্কসহ মোট রাজস্বের হার প্রায় ৮২ শতাংশ বিবেচনায় নিলে এই পরিমাণ সিগারেটের সঙ্গে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকার রাজস্ব সংশ্লিষ্টতা তৈরি হতে পারে।
আর একই পরিমাণ কাঁচামাল উচ্চ শ্রেণির সিগারেট তৈরিতে ব্যবহৃত হলে সম্ভাব্য রাজস্ব সংশ্লিষ্টতার পরিমাণ প্রায় ৫৬৪ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে জানিয়েছে সিআইসি।
তবে এগুলো প্রাথমিক হিসাব এবং কাঁচামালটি বাস্তবে কোথায় ও কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে—সে বিষয়ে তদন্ত এখনো চলমান।
এক অর্থবছরেই সাড়ে ৩ লাখ কেজির বেশি আমদানি
সিআইসির তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিক ট্রেডার্স আলোচিত চালানসহ মোট ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৩৭ কেজি অ্যাসিটেট টো আমদানি করেছে।
ফলে প্রতিষ্ঠানটির আগের চালানগুলো কোথায় গেছে, কার কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করা হয়েছে এবং সেগুলো শেষ পর্যন্ত কোন কাজে ব্যবহৃত হয়েছে—এসব বিষয়ও রাজস্ব গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে গুরুত্ব পাচ্ছে।
আরও চার প্রতিষ্ঠানের সন্ধান
অনুসন্ধানের পরিধি বাড়ানোর পর অ্যাসিটেট টো আমদানির সঙ্গে যুক্ত আরও চারটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য পেয়েছে এনবিআর। সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগের যাচাই অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ঠিকানাতেও বাস্তব ব্যবসায়িক কার্যক্রম পাওয়া যায়নি।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে সিআইসির ধারণা, কিছু প্রতিষ্ঠান নামমাত্র নিবন্ধন ব্যবহার করে উচ্চ রাজস্ব সংশ্লিষ্ট অ্যাসিটেট টো আমদানি করে পরবর্তী সময়ে তা অবৈধভাবে বিক্রি বা অন্যত্র হস্তান্তর করে থাকতে পারে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
বর্তমানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি করা অ্যাসিটেট টোর প্রকৃত ব্যবহারকারী কারা, কোথায় সরবরাহ করা হয়েছে, বিক্রয় ও আর্থিক লেনদেন কীভাবে হয়েছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয় যাচাই করছে সিআইসি।
এনবিআর ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটগুলোকে অ্যাসিটেট টোর সরবরাহ শৃঙ্খল যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে।
এনবিআরের হিসাবে, সিআইসির হস্তক্ষেপে আলোচিত একটি চালান থেকেই আমদানি পর্যায়ে ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি কাঁচামালটি স্থানীয়ভাবে মাঝারি শ্রেণির সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় প্রায় ৩২৪ কোটি টাকার রাজস্ব ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এসেছে।

