নিজ দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা এখনো প্রবল রোহিঙ্গাদের • বাংলাদেশে আশ্রিত ১০ লাখের বেশি মানুষ • আলোচনাকেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ বললেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি • বিশ্ব সম্প্রদায়ের নতুন করে মনোযোগ ও সহযোগিতা চায় ঢাকা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রান্তকাল
নিউইয়র্ক, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬: দীর্ঘদিন ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকটকে ‘গুরুতর মানবিক সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তাঁর মতে, সহিংসতা কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারে না; বরং আলোচনা, সমঝোতা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘের হাই-লেভেল উইককে সামনে রেখে ইউএন নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা সহিংসতার শিকার হয়েছে, তাদের বসতবাড়ি ও গ্রাম ধ্বংস হয়েছে এবং নিজেদের দেশ থেকেই তাদের বিতাড়িত হতে হয়েছে। একই সঙ্গে চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও এই জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার সক্ষমতা এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
‘আমরা বাড়ি ফিরতে চাই’
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে গিয়ে ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ মহাসচিবের কক্সবাজার সফরের অভিজ্ঞতা স্মরণ করেন। তিনি জানান, রমজানের এক সন্ধ্যায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা মহাসচিবের সঙ্গে ইফতারে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে মূল বার্তা ছিল—তারা নিজেদের দেশে ফিরে যেতে চান।
এই অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষার কথা তুলে ধরে খলিলুর রহমান বলেন, সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান না করে সেটিকে দীর্ঘায়িত ও আরও জটিল করে তোলে। তাই তাঁর দৃষ্টিতে আলোচনার টেবিলে আসা, সমঝোতা এবং পক্ষগুলোর একসঙ্গে কাজ করাই সংকট নিরসনের কার্যকর পথ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে তিনি এমন একটি মঞ্চ হিসেবে দেখছেন, যেখানে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে সংলাপের সুযোগ তৈরি হয়।
প্রত্যাবাসন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। গত জুনে সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ছয় ধাপে ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে পাঠিয়েছে। তখন পর্যন্ত যাচাই হওয়া ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫০৩ জনের মধ্যে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬ জনকে মিয়ানমার তাদের দেশে আগে বসবাসকারী ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তবে প্রত্যাবাসন শুরুর নির্দিষ্ট সময়সীমা তখনও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সেখানে চলমান সংঘাত প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে আছে। বাংলাদেশ মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার অবস্থান হলো—রোহিঙ্গাদের এমন পরিবেশে ফেরত পাঠাতে হবে, যেখানে তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও টেকসইভাবে বসবাসের সুযোগ নিশ্চিত থাকবে।
জাতিসংঘে রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ
রোহিঙ্গা সংকটকে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ঘিরে উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এর আগে জানিয়েছেন, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর লক্ষ্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আরও সুসংহত করা এবং প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদার করা।
এদিকে রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু মানবিক দুর্ভোগই বাড়াবে না, আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে—এমন উদ্বেগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উঠে আসছে। সম্প্রতি ওআইসির নতুন মহাসচিব ইসমাইল ওলদ শেখ আহমেদ দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের প্রতি সংস্থাটির সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন এবং দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
জাতিসংঘে আস্থা ফেরানোর ওপর জোর
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গের পাশাপাশি জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও সংস্থাটির প্রতি সদস্যরাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের বিষয়টিকেও নিজের সভাপতিত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন ড. খলিলুর রহমান।
তিনি এমন এক সময়ে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন, যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, মানবিক সংকট এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—“Restoring trust, managing transformation: a United Nations that delivers for all”।
ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকট তাই শুধু বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘদিনের মানবিক চাপ হিসেবেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও মানবাধিকার রক্ষার একটি চলমান পরীক্ষা হিসেবেও উঠে এসেছে। তাঁর মূল বার্তা—সংঘাত দীর্ঘায়িত করার পরিবর্তে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমেই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি করতে হবে।

