সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মহাসড়কের ২৪ ট্রমা সেন্টার চালুর উদ্যোগ, গড়ে উঠছে ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক

দীর্ঘদিন অব্যবহৃত কেন্দ্রগুলোর নতুন নাম হবে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত জরুরি চিকিৎসার আওতায় আনতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত ২৪টি ট্রমা সেন্টার সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কেন্দ্রগুলো আধুনিকায়নের পাশাপাশি দেশব্যাপী ২৪ ঘণ্টার সমন্বিত অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদ্যমান ট্রমা সেন্টারগুলোর নাম পরিবর্তন করে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ করা হবে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য লজিস্টিকস নিশ্চিত করে পর্যায়ক্রমে ২৪টি কেন্দ্রেই চিকিৎসাসেবা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত ১২ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক বৈঠকে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত এসব কেন্দ্র দ্রুত কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়কের পাশে প্রয়োজনীয় স্থানে প্রকল্পের আওতায় নতুন ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তও হয়।

কেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী এক্স-রে মেশিন, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনুমোদিত বাজেট থেকে নির্বাহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নির্মাণ হয়েছে, সেবা মেলেনি

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিকে দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্যেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে এসব ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছিল। বিশেষ করে মাথা, বুক, মেরুদণ্ড ও হাড়ে গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় এনে প্রাণহানি কমানো ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১০টি এবং ২০১০ সালে আরও ১৪টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে অধিকাংশ কেন্দ্রই পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি।

২৪টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র দুটিতে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগীয় সেবা চালু রয়েছে। আরেকটি সংশ্লিষ্ট জেলা হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

চিকিৎসক-নার্সের ঘাটতিই বড় বাধা

মূল জনবল পরিকল্পনায় প্রতিটি ট্রমা সেন্টারে সাতজন কনসালট্যান্ট, তিনজন অর্থোপেডিক সার্জন, দুজন অ্যানেসথেটিস্ট ও দুজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ মোট ১৪ জন চিকিৎসক রাখার কথা ছিল।

এ ছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রে ১০ জন নার্সের পাশাপাশি ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফার এবং প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান নিয়োগের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কোনো কেন্দ্রেই প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

১১ কোটি টাকার কেন্দ্রও ছয় বছর অব্যবহৃত

অব্যবহৃত কেন্দ্রগুলোর একটি সিরাজগঞ্জ সদরের মুলিবাড়ি ট্রমা সেন্টার। ঢাকা-রাজশাহী-রংপুর মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহতদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিতে ২০২০ সালে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়।

দীর্ঘ ছয় বছর অব্যবহৃত থাকার পর গত কোরবানির ঈদ ঘিরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার জন্য ২১ মে থেকে ১৪ দিনের জন্য অস্থায়ীভাবে এটি চালু করা হয়েছিল। পরে কেন্দ্রটি আবার বন্ধ হয়ে যায়।

পাবনার আটঘরিয়া, বগুড়ার শেরপুর, সিরাজগঞ্জ সদর ও উল্লাপাড়া, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, গোপালগঞ্জ সদর, মাদারীপুরের শিবচর, মানিকগঞ্জের শিবালয়, শরীয়তপুরের জাজিরা, ফরিদপুরের ভাঙ্গা-মধুখালী, মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর, ঢাকার ধামরাই, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, হাটহাজারী ও রাউজান, কুমিল্লার দাউদকান্দি, ময়মনসিংহের ভালুকা, সুনামগঞ্জের ছাতক এবং হবিগঞ্জের বাহুবলসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এসব কেন্দ্র রয়েছে।

২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, মহাসড়ককেন্দ্রিক ২৪টি ট্রমা সেন্টার দ্রুত ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সেন্টার’-এ রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু কেন্দ্র চালু করাই নয়—দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তির কাছে দ্রুত পৌঁছাতে অ্যাম্বুলেন্স, মোটরসাইকেল ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে একটি জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজও চলছে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দুর্ঘটনাস্থল থেকে রোগী উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং দ্রুত নিকটবর্তী জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হবে। সরকারের লক্ষ্য, ভবিষ্যতে এ ব্যবস্থাকে দেশের নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর একটি টেকসই অংশে পরিণত করা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন