মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ • নিয়োগ-পদায়ন ও টেন্ডারে ঘুষের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে • অনুসন্ধানের আওতায় বাবা ও সাবেক দুই সহকারী

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে অর্থ স্থানান্তর এবং সম্পদ ও ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ এসেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সহকারী পরিচালক তানজীর আহমেদ এসব তথ্য জানান।

দুদক জানিয়েছে, অর্থপাচারের অভিযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন নিয়োগ ও পদায়নে ঘুষ, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও অনুসন্ধান করা হবে।

আসিফ মাহমুদের পাশাপাশি তাঁর বাবা বিল্লাল হোসেন এবং সাবেক দুই সহকারী মোয়াজ্জেম হোসেন ও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার ভূমিকার বিষয়টিও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে বলে জানানো হয়।

কোন দেশে কত অর্থ পাচারের অভিযোগ

দুদকে জমা পড়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন দেশে স্থানান্তর করেছেন। এর মধ্যে দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। চার দেশের অঙ্ক যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ১১ হাজার কোটি টাকা।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, এসব অর্থের একটি অংশ দিয়ে বিদেশে ভিলা বা ভবন কেনা এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার অভিযোগও দুদকে জমা পড়েছে।

এ ছাড়া তাঁর দুই ভগ্নিপতি ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দুদক জানিয়েছে, অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে।

ডিসি পদায়ন থেকে সিটি প্রশাসক নিয়োগ—ঘুষের অভিযোগ

অর্থপাচারের পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদায়নে বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও অনুসন্ধান করবে দুদক।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে জনপ্রতি ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগে ১০ কোটি টাকা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি শীর্ষ পদে নিয়োগে ৫২ কোটি এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগও জমা পড়েছে।

তবে এসব অভিযোগও অনুসন্ধানাধীন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার তথ্য দুদক জানায়নি।

টেন্ডারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্প এবং ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপের ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।

‘শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম’ প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও দুদকের কাছে জমা পড়েছে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

বাবা ও দুই সাবেক সহকারীর ভূমিকাও অনুসন্ধানে

দুদকে জমা পড়া অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন এবং তাঁর সাবেক এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি সিন্ডিকেটে প্রভাব বিস্তার ও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে।

সাবেক পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের সহকারী পরিচালক তানজীর আহমেদ বলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পর প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত এসব অভিযোগের বিষয়ে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া কিংবা অভিযোগে নাম আসা অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন