শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেতানিয়াহু ফের নির্বাচিত হলে ইসরায়েলের বিষয়ে কঠোর অবস্থান চাইলেন হিলারি ক্লিনটন

২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন

‘ইসরায়েলকে ভালোবাসি, কিন্তু নেতানিয়াহু সরকার ও তার নীতি অপছন্দ করি’ • ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা • নতুন সরকার এলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সুযোগ দেখছেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার নেতৃত্বাধীন জোট আবার ক্ষমতায় এলে দেশটির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘খুব কঠোর অবস্থান’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম MS NOW-এর ‘মর্নিং জো’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।

আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার আগে সরকারের ভূমিকা, গাজা যুদ্ধ এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাসহ বিভিন্ন বিষয় নতুন করে দেশটির রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে।

হিলারি ক্লিনটন বলেন, ইসরায়েলি ভোটাররা যদি বর্তমান ধরনের সরকারকেই আবার নির্বাচিত করেন, তাহলে ওয়াশিংটনের উচিত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া।

একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর পরিবর্তে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও গঠনমূলকভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও মত দেন তিনি।

‘ইসরায়েলকে ভালোবাসি, নেতানিয়াহুর নীতি অপছন্দ করি’

ইসরায়েলের প্রতি নিজের সমর্থন এবং নেতানিয়াহু সরকারের বিরোধিতার মধ্যে পার্থক্য টানেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “আমি বারবার বলেছি, আমি ইসরায়েলকে ভালোবাসি এবং নেতানিয়াহুর সরকার ও তার নীতিকে ঘৃণা করি।”

একই প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারেরও সমালোচনা করেন হিলারি। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী ছিলেন তিনি।

হিলারির মতে, নেতানিয়াহু সরকারের বর্তমান নীতি ইসরায়েলের জন্য ক্ষতিকর। একইভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেন তিনি।

৭ অক্টোবরের আগে সতর্কবার্তা নিয়ে নতুন বিতর্ক

হিলারির বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার আগে নেতানিয়াহু কোনো সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে সম্প্রতি ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান নেতানিয়াহুকে হামাসের সম্ভাব্য বড় ধরনের হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।

হিলারি ওই প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ তুলে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সতর্কবার্তা পাওয়ার পর নেতানিয়াহু সেটি বিশ্বাস করেননি কি না, কিংবা পরিস্থিতি সম্পর্কে তার চিন্তা কী ছিল—তা তিনি জানেন না।

তবে তার মতে, শেষ পর্যন্ত ৭ অক্টোবরের ঘটনা ছিল নেতৃত্ব ও ইসরায়েলি জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যর্থতা।

সতর্কবার্তার দাবি অস্বীকার নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের

তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে এমন সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন—এ দাবি অস্বীকার করেছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

নেতানিয়াহুর দপ্তরের ভাষ্য, ৭ অক্টোবরের আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে এ ধরনের কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। প্রাসঙ্গিক কোনো গোয়েন্দা তথ্য থাকলে তা দুই দেশের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা চ্যানেলের মাধ্যমেই আদান-প্রদান হওয়ার কথা।

ফলে বিষয়টি এখনো বিতর্কিত এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ওঠা দাবি ও নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধের আহ্বান

হিলারি ক্লিনটন শুধু গাজা বা ৭ অক্টোবরের ঘটনা নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়েও কথা বলেন।

তার মতে, ইসরায়েলে নতুন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এলে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এ ধরনের সহিংসতার ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সুযোগ থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

হিলারি বলেন, এর ফলে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ও অন্যান্য দুর্ভোগ তো হচ্ছেই; একই সঙ্গে সমাজের মধ্যে এ ধরনের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে দেওয়া ইসরায়েলের নিজের জন্যও বিপজ্জনক।

তিনি মনে করেন, নির্বাচনের পর সরকার পরিবর্তিত হলে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র নতুন একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেতে পারে।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও বহাল রয়েছে।

আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বার ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

আদালতের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় অন্তত ৮ অক্টোবর ২০২৩ থেকে ২০ মে ২০২৪ সময়কালে সংঘটিত কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের জন্য তাদের অপরাধমূলক দায় থাকার যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে বলে বিচারকেরা মনে করেছেন।

তবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কোনো চূড়ান্ত দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় নয়। নেতানিয়াহু ও ইসরায়েল সরকার আইসিসির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে এবং আদালতের এখতিয়ার নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে।

আইসিসির নিজস্ব নথিতেও নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত এবং ‘at large’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২৭ অক্টোবরের নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। দেশটির পার্লামেন্ট নেসেট ভেঙে যাওয়ার পর এ নির্বাচনের পথ তৈরি হয়।

নেতানিয়াহু আবারও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো তার জন্য কঠিন রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু তার ডানপন্থী রাজনৈতিক শিবিরের ছোট দলগুলোকে একত্রিত করার চেষ্টা করছেন, যাতে ভোট বিভক্ত হয়ে কোনো মিত্র দল নেসেটে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের সীমা অতিক্রম করতে ব্যর্থ না হয়। একই সঙ্গে জরিপে তার লিকুদ পার্টি ও বর্তমান জাতীয়তাবাদী-ধর্মীয় জোটের সমর্থন কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যর্থতা, পরবর্তী গাজা যুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন জরিপে বর্তমান জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর সম্ভাবনা দেখা গেলেও নেতানিয়াহুর বিরোধীরা এখনো সরকার গঠনের নিশ্চিত পথ তৈরি করতে পারেনি। ফলে নির্বাচনের ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

গাজা ও নেতানিয়াহু প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রেও বিভক্তি

গাজা যুদ্ধের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। একই সময়ে গাজায় বিপুল প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়ের কারণে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ওয়াশিংটনের সমর্থন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।

হিলারি ক্লিনটন দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে এলেও বর্তমান নেতানিয়াহু সরকার ও তার নীতির সমালোচনা করছেন।

তার সর্বশেষ বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেই—তিনি ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রত্যাহারের কথা বলেননি; বরং কে ইসরায়েল পরিচালনা করছে এবং সেই সরকার কী নীতি অনুসরণ করছে, তার ওপর ওয়াশিংটনের অবস্থান নির্ভর করা উচিত বলে মত দিয়েছেন।

২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা আবার ক্ষমতায় ফিরলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক কী পথে যাবে, সেটিই এখন হিলারি ক্লিনটনের মন্তব্যের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন