শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দুই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র

ভয়াবহ বন্যায় নেপালের দুটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশি নদী অববাহিকায় আকস্মিক বন্যার পর বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন পাওয়া চিলিমে ও ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ফলে ভারতীয় গ্রিডের মাধ্যমে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ এখন প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

নেপালের সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্ষাকালে নদীতে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় নেপালের জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সাধারণত বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ভারত ও বাংলাদেশে রপ্তানি করে দেশটি। তবে ভোতেকোশি নদীর ভয়াবহ বন্যা এবার সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।

বন্যার পর নেপালের অন্তত ১২টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন পাওয়া ২২ দশমিক ১ মেগাওয়াটের চিলিমে এবং ২৪ মেগাওয়াটের ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও রয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে প্রকল্প দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।

চিলিমে প্রকল্প থেকে ভারতকে ২১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং ত্রিশূলী প্রকল্প থেকে ১৮ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির অনুমোদন ছিল। একই সঙ্গে ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহেরও অনুমতি ছিল প্রকল্প দুটির। বাংলাদেশে রপ্তানি করা বিদ্যুতের মূল্য মার্কিন ডলারে পায় নেপাল।

নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা দুটি প্রকল্পই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে বিকল্প কোনো সচল প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানোর অনুমতি দিতে ভারতের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। তবে অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যত বন্ধ থাকবে।

বন্যার প্রভাব পড়েছে নেপালের বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোতেও। সাঞ্জেন, আপার সাঞ্জেন ও সালাসুঙ্গি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এগুলোকে ‘আইসোলেটেড মোডে’ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন রেখে এসব কেন্দ্র কেবল আশপাশের এলাকার চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

তবে শুধু বন্যার কারণেই নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি কমেনি। ভারতীয় অনুমোদন নবায়ন না হওয়ায় আরও তিনটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৭৩ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে পারছে না নেপাল।

৩৮ দশমিক ৮ মেগাওয়াটের আপার চামেলিয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিদ্যুৎ রপ্তানি অনুমোদনের মেয়াদ ৩১ জুন শেষ হওয়ার পরও তা নবায়ন করা হয়নি। অন্যদিকে ২৪ দশমিক ২৫ মেগাওয়াটের সেতী রিভার এবং ১০ দশমিক ৭০ মেগাওয়াটের আপার তাদি খোলা প্রকল্পের অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ৩১ জুলাই। অনুমোদন নবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এসব প্রকল্পের বিদ্যুৎ ভারতে রপ্তানি করতে পারবে না নেপাল।

নির্দিষ্ট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিদ্যুৎ বিদেশে রপ্তানির জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। বর্তমানে নেপালের ৩৭টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে ভারত। এসব প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। চিলিমে ও ত্রিশূলী প্রকল্পও এই তালিকায় রয়েছে।

বর্ষাকালে নেপাল সাধারণত প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করে। তবে বন্যা ও অন্যান্য কারণে বর্তমানে দেশটির বিদ্যুৎ রপ্তানি কমে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।

নেপাল দীর্ঘদিন ধরে শুষ্ক মৌসুমে বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে বর্ষাকালে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে রপ্তানির মাধ্যমে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে দেশটি। কিন্তু বিদ্যুৎ রপ্তানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভোতেকোশির বন্যায় উৎপাদন ও সঞ্চালন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেই উদ্যোগ বড় ধাক্কা খেয়েছে।

এখন ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সঞ্চালন অবকাঠামো দ্রুত সচল করার পাশাপাশি বিকল্প কোনো প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ভারতের অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন