বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

চীনে তীব্র সমালোচনার মুখে এমবাপ্পে, ক্ষমা চাইলেন ফরাসি তারকা

ক্ষমা চাইলেন ফরাসি তারকা, সম্প্রচার বন্ধের খবরও প্রকাশিত

চীনের প্রয়াত নেতা মাও সেতুংকে নিয়ে অবিবেচকের মতো মন্তব্য করার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন ফ্রান্সের ফুটবল তারকা ও রিয়াল মাদ্রিদের ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে। তাঁর মন্তব্য ঘিরে চীনে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হওয়ার পর কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠান তাঁর সঙ্গে বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতার চুক্তি বাতিল করেছে। চীনা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিতে এমবাপ্পেকে নিয়ে কোনো বিষয়বস্তু প্রচার না করার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি স্পেনের ফুটবল লিগের খেলাও সম্প্রচার বন্ধের খবর এসেছে।

এক বিবৃতিতে এমবাপ্পে বলেন, তাঁর মন্তব্যটি অবিবেচকের মতো ছিল। এখন তিনি বুঝতে পারছেন, এতে চীনের অনেক মানুষ এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী চীনা সম্প্রদায়ের মানুষ কষ্ট পেয়েছেন। যাঁরা তাঁর কথায় আঘাত পেয়েছেন, তাঁদের সবার কাছে ক্ষমা চান তিনি।

কী বলেছিলেন এমবাপ্পে

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফরাসি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ‘দ্য ব্রিজ’-এ এক সাক্ষাৎকারে মাও সেতুংকে ঘিরে একটি ব্যঙ্গচিত্র নিয়ে কথা বলেন এমবাপ্পে। একটি দৃশ্য তাঁকে সবচেয়ে বেশি হাসায় বলে উল্লেখ করেন তিনি। এরপর মাও সেতুংয়ের মতো দেখতে একটি ছবির ওপর তাঁর নিজের মুখ বসানো দৃশ্য দেখে হেসে ওঠেন এই ফুটবলার।

ফুটবল বিশ্বে তাঁর ব্যাপক প্রভাবের কারণে এমবাপ্পেকে নিয়ে অনলাইনে প্রায়ই স্বৈরশাসকদের সঙ্গে তুলনা করে ব্যঙ্গচিত্র তৈরি করা হয়। আলোচিত ছবিটিও সেই ধরনের রসিকতার অংশ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিভিন্ন অংশে এমবাপ্পেকে সরাসরি মাও সেতুংয়ের নাম উল্লেখ করতে দেখা যায়নি। তিনি বলেছেন, ‘আমি বন্ধুদের সঙ্গে সব সময় এই ব্যঙ্গচিত্রটি ব্যবহার করি।’

সাক্ষাৎকারটির মূল ভিডিও এখন অনুষ্ঠানটির ইউটিউব চ্যানেলে পাওয়া যাচ্ছে না। রিয়াল মাদ্রিদের আরেক ফুটবলার অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি উপস্থাপিত সাক্ষাৎকারটি প্রথম কবে প্রচারিত হয়েছিল, সেটিও স্পষ্ট নয়।

চীনে ক্ষোভ ছড়াল যেভাবে

সোমবার রাতে বিতর্কটি তীব্র হয়ে ওঠে বলে মনে হচ্ছে। ওই রাতে চীনের ফুটবলবিষয়ক অনলাইন ফোরাম ‘দংচিউদি’ এক বিবৃতিতে এমবাপ্পের মন্তব্যের বিষয়টি সামনে আনে। সেখানে মন্তব্যগুলোকে ‘অনুপযুক্ত’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়, এগুলো চীনের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছে।

এরপর ভিডিওর স্থিরচিত্র ও ব্যঙ্গচিত্রটি চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে এমবাপ্পে ও তাঁর ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ—উভয়কেই বর্জনের আহ্বান জানান।

দংচিউদি জানিয়েছে, মন্তব্যগুলো চীন ও চীনের জনগণের জন্য অপমানজনক হওয়ায় সেগুলো অনুবাদ করাও তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ঠিক কী বলা হয়েছিল, তা জানতে চেয়েছেন।

কিছু ব্যবহারকারী ব্যঙ্গচিত্রটি ঝাপসা করে প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে এমবাপ্পের বক্তব্যের যে অংশে ‘একজন চীনা স্বৈরশাসক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, সেটিও ঝাপসা করেছেন।

চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবোতে সমালোচকেরা অভিযোগ করেছেন, এমবাপ্পে চীনের বাজার থেকে মুনাফা অর্জন করছেন, অথচ চীনের সাধারণ মানুষকে অপমান করে এমন মন্তব্য করছেন। একটি আলোচিত মন্তব্যে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পরিচিত ব্যক্তিদের আরও শ্রদ্ধাশীল ও সংবেদনশীল হওয়া উচিত এবং জাতীয় অনুভূতিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

তবে কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী এমবাপ্পের পক্ষেও কথা বলেছেন। দেশটির কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবস্থায় সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়ে এমন ভিন্নমত প্রকাশ তুলনামূলকভাবে বিরল।

চুক্তি বাতিল করছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো

অনলাইনে সমালোচনা বাড়তে থাকায় চীনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এমবাপ্পের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে শুরু করে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশ্য বিবৃতিতে আলোচিত ভিডিওটির কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।

চীনের বৃহত্তম দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেংনিউ এক বিবৃতিতে বলেছে, চীনের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন যেকোনো কথা বা কাজের তারা দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করে এবং এ ধরনের আচরণের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয় না।

বৃহৎ পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দংপেংও একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন আচরণ তারা সমর্থন করে না।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদপত্র ‘দ্য গ্লোবাল টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির সংবাদভিত্তিক বিভিন্ন অ্যাপে এমবাপ্পেকে নিয়ে কোনো বিষয়বস্তু প্রচার করা হবে না। চীনা সংবাদমাধ্যম মঙ্গলবার জানিয়েছে, সিসিটিভি স্পেনের ফুটবল লিগের খেলাও সম্প্রচার বন্ধ করবে।

রিয়াল মাদ্রিদ স্পেনের ওই লিগে অংশ নেওয়া ২০টি ক্লাবের একটি। ক্লাবটি এ পর্যন্ত ৩৬ বার লিগ শিরোপা জিতেছে, যা লিগটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিতর্কটি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো সম্পর্কে তাঁরা অবগত হয়েছেন। চীনের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কথা ও আচরণের বিরুদ্ধে দেশটির সমাজের বিভিন্ন মহল থেকে স্বাভাবিকভাবেই বিরোধিতা আসবে।

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টা নাগাদ ওয়েইবোর সর্বাধিক আলোচিত ১০টি বিষয়ের মধ্যে পাঁচটিই ছিল এমবাপ্পেকে ঘিরে। তালিকার শীর্ষে ছিল একাধিক প্রতিষ্ঠান তাঁর সঙ্গে অংশীদারত্ব ছিন্ন করেছে—এমন একটি হ্যাশট্যাগ। আলোচিত মন্তব্যগুলোর একটিতে লেখা হয়, ‘কখনোই চীনে আসবেন না।’

মাও সেতুংকে নিয়ে বিতর্ক এত সংবেদনশীল কেন

১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা করেন মাও সেতুং। এরপর কয়েক দশক ধরে তিনি দেশটির নেতৃত্ব দেন। তাঁর শাসনামলে দ্রুত শিল্পায়নের উদ্যোগ ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়, যাতে কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক হিসাব ও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর শুরু হয় ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’। কমিউনিজমের জন্য হুমকি বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই অভিযানে বুদ্ধিজীবী, জমির মালিক, শিল্পী এবং কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বীরাও নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হন।

১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পর চীন ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নিজেদের দরজা খুলতে শুরু করে। তবে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি তাঁকে জাতীয় প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে আসছে। তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা ও সমালোচনার ক্ষেত্রও সীমিত।

এ কারণে মাওকে নিয়ে কৌতুক বা ব্যঙ্গচিত্রকে চীনে শুধু একজন ঐতিহাসিক নেতাকে উপহাস করার বিষয় হিসেবে দেখা হয় না। এটি দেশটির ইতিহাস সম্পর্কে ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রিত বয়ানের প্রতিও চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

চীনের ইন্টারনেটে সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। ফলে এমবাপ্পের মতো বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াবিদকে ঘিরে বিতর্কটি দ্রুত বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বৈশ্বিক তারকা এমবাপ্পে ও তাঁর ব্যঙ্গচিত্র

এমবাপ্পে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত ফুটবলার। তাঁর গতি, গোল করার দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তা তাঁকে ফুটবলের বাইরেও ফ্যাশন, সংস্কৃতি ও ব্যবসার জগতে পরিচিত করেছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা চুক্তি রয়েছে।

তাঁকে স্বৈরশাসকদের সঙ্গে তুলনা করে অনলাইনে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ব্যঙ্গচিত্র তৈরি হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে এক ফরাসি ইনফ্লুয়েন্সার ও কাবাব দোকানের মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন এমবাপ্পে। ওই ব্যক্তি দোকানের একটি খাবারের বর্ণনায় তাঁর নাম ব্যবহার করেছিলেন। ঘটনাটি তাঁর ডাকনাম ও তাঁকে ঘিরে রসিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপের সময় ফ্রান্সের সতীর্থ উসমান দেম্বেলে তাঁকে ‘মোবুত’ বলে ডাকেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নামটি কঙ্গোর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের সাবেক শাসক মোবুতু সেসে সেকোর প্রতি ইঙ্গিত করে। মোবুতু প্রায় তিন দশক দেশটি শাসন করেছিলেন।

এর আগে সেপ্টেম্বরে ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পে এসব ব্যঙ্গচিত্র নিয়ে কথা বলেন। তিনি স্বীকার করেন, অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোর পেছনে নিছক মজা করার উদ্দেশ্য থাকে। তবে কখনো কখনো এগুলো মানুষের রাজনৈতিক ও মানবিক সচেতনতার অভাবও প্রকাশ করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এমবাপ্পে আরও বলেন, ইতিহাসে যাঁরা বহু মানুষের ক্ষতি করেছেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁকে তুলনা করার বিষয়টি কম হাস্যকর। অন্য মানুষকে হত্যা করেছেন বা লাখ লাখ মানুষকে চরম দুর্ভোগের মধ্যে ফেলেছেন—এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা তিনি যথাযথ মনে করেন না।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন