বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

মন্ত্রীর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারির পর এলপিজির দোকান বন্ধের কর্মসূচি প্রত্যাহার

২৯ অক্টোবর গণশুনানির আশ্বাস বিইআরসির, সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ১৫০ টাকা করার দাবি ব্যবসায়ীদের

জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারির ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সারা দেশে দুই দিন এলপিজির দোকান বন্ধ রাখার কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের পর বুধবার বিকালে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের নেতারা।

বৈঠকে আগামী ২৯ অক্টোবর সকাল ১০টায় গণশুনানি আয়োজন করে ব্যবসায়ীদের দাবিগুলো বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি মো. সেলিম খান।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বুধবার বিকাল ৩টার দিকে বিইআরসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়। সেখানে ব্যবসায়ীদের দাবি নিয়ে গণশুনানির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠনটি।

এর আগে ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করে দুই দিনের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে পরবর্তী সময়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য দোকান বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন সেলিম খান।

আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দুই মন্ত্রীর

ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আসার আগে বুধবার সকালে সচিবালয়ে এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট প্রত্যাহার না করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলপিজি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হওয়ায় এর সরবরাহ বন্ধ করে দাবি আদায়ের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ১৯৫৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইনে এ ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায় কমিশন, লাভ-লোকসানসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমস্যা থাকতে পারে। তবে এসব সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ শুনতে প্রস্তুত রয়েছে।

একই সঙ্গে বাজার পরিস্থিতিকে ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করে দেশকে জিম্মি করার কোনো প্রচেষ্টা সরকার মেনে নেবে না বলে সতর্ক করেন তিনি।

সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ১৫০ টাকা করার দাবি

এলপিজি ব্যবসায়ীদের প্রধান দাবি, প্রতিটি সিলিন্ডারে পরিবেশকদের কমিশন বাড়িয়ে ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে।

সেলিম খানের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগে বিইআরসি পরিবেশকদের জন্য সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা কমিশন নির্ধারণ করেছিল। এরপর জ্বালানি, পরিবহন, সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো, গুদামভাড়া ও লাইসেন্স ফিসহ বিভিন্ন খরচ বেড়েছে। বর্তমান কমিশনে এসব ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

বিইআরসিকে দেওয়া চিঠিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, কোম্পানি থেকে পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত একটি সিলিন্ডার আনতে ৫০ টাকা খরচ হয়। সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো এবং খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে আরও ৩৫ টাকা ব্যয় হয়। এ ছাড়া কর্মচারীদের বেতন, গুদামভাড়া ও অন্যান্য খাতে খরচ হয় ২৫ টাকা। এসব ব্যয়ের সঙ্গে ৪০ টাকা মুনাফা যোগ করে সিলিন্ডারপ্রতি ১৫০ টাকা কমিশন নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে তারা।

ব্যবসায়ীদের সাত দফা দাবি

কমিশন বাড়ানোর পাশাপাশি এলপিজি ব্যবসায়ীদের আরও কয়েকটি দাবি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, বিইআরসি মাসে একবার দাম ঘোষণা করার পর কোনো কোম্পানি নতুন করে দাম পরিবর্তন করতে চাইলে কমিশনের মাধ্যমেই তা করতে হবে। কোম্পানির চালানে প্রকৃত মূল্য উল্লেখ করতে হবে এবং যেসব কোম্পানি পরিবেশকের গুদামে সিলিন্ডার পৌঁছে দেয় না, তাদের ন্যায্য পরিবহনভাড়া দিতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না—এমন কোম্পানিগুলোর অব্যবহৃত সিলিন্ডারে পুনরায় গ্যাস ভরে বাজারে ছাড়ার ব্যবস্থাও চান ব্যবসায়ীরা।

তাদের অভিযোগ, অনেক কোম্পানি আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলতে না পারায় সারা দেশে কয়েক লাখ সিলিন্ডার অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এতে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।

এ ছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহনের গাড়িতে নিরাপত্তার জন্য রেলিং রাখায় ট্রাফিক পুলিশের মামলা এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে অযৌক্তিক জরিমানা করার অভিযোগ তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। এসব হয়রানি বন্ধের দাবিও রয়েছে তাদের সাত দফার মধ্যে।

নির্ধারিত দামে এলপিজি না পাওয়ার অভিযোগ

গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

বুধবারের সংবাদ ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে সিলিন্ডারপ্রতি প্রায় এক হাজার টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ তোলেন।

জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ডিলার পর্যায়ে অনিয়ম ঠেকাতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনকে সক্রিয় করা হয়েছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

তিনি বলেন, এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে এটি সরকারের তৃতীয় বৈঠক। আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দাম ও সরবরাহ নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা সমাধানের চেষ্টা চলছে। আগামী ৩০ অক্টোবর অপারেটরদের সঙ্গে আবারও বৈঠক হবে।

এর আগেও ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছিলেন ব্যবসায়ীরা

এর আগে গত ৮ জানুয়ারি প্রশাসনিক অভিযান ও জরিমানার প্রতিবাদে সারা দেশে এলপিজি সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রেখেছিলেন ব্যবসায়ীরা। ওই দিন বিইআরসির সঙ্গে বৈঠক এবং দাবি পূরণের আশ্বাস পাওয়ার পর বিকালে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।

এবারও কমিশন বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবিতে দোকান বন্ধের কর্মসূচি ঘোষণার পর সরকারের কঠোর অবস্থান এবং বিইআরসির গণশুনানির আশ্বাসের মধ্যে কর্মসূচি প্রত্যাহার করলেন ব্যবসায়ীরা। এখন ২৯ অক্টোবরের গণশুনানিতে তাদের দাবিগুলোর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেদিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন