২০২৮ সালের মধ্যে তিন প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিকল্পনা; আইপিও থেকে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ, ২০৩৫ সালে উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ১৬০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য
ভারী জ্বালানি তেলনির্ভরতা কমিয়ে ব্যবসায় বৈচিত্র্য আনা এবং দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে কনফিডেন্স গ্রুপ। ২০২৮ সালের মধ্যে মোট ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। চট্টগ্রাম, বাগেরহাটের মোংলা ও চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি চট্টগ্রাম ও বাগেরহাটে ১০০ মেগাওয়াট করে মোট ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। এর মধ্যে মোংলার কাছে বাগেরহাটে নির্মিতব্য ১০০ মেগাওয়াট প্রকল্পটি ডরিন পাওয়ারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়ন করা হবে। এ প্রকল্পে ডরিন পাওয়ারের মালিকানা থাকবে ৬০ শতাংশ।
এ ছাড়া ফটিকছড়িতে আরও ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কনফিডেন্স এন্টারপ্রাইজেস ও কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি যৌথভাবে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
সম্প্রতি বগুড়ায় কনফিডেন্সের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মী ও পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানিটির পক্ষ থেকে এসব পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়নে আইপিও থেকে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা
নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থায়নের অংশ হিসেবে পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায় কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি। এ জন্য বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ার ছাড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কোম্পানিটির প্রাথমিক প্রসপেক্টাস বা রেড-হেরিং প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, প্রস্তাবিত শেয়ার বিক্রির বিষয়ে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের অবহিত করতে আগামী ১৮ অক্টোবর একটি রোডশোর আয়োজন করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা সরাসরি, ডিজিটাল মাধ্যমে অথবা উভয় পদ্ধতিতে অংশ নিতে পারবেন।
আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থের ৮৩ শতাংশ দুটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি কেনা ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি অর্থের মধ্যে ১৫ শতাংশ ঋণ পরিশোধে এবং ২ শতাংশ আইপিও-সংশ্লিষ্ট ব্যয়ে ব্যবহার করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংগৃহীত তহবিল থেকে ২৩০ কোটি টাকা চট্টগ্রামের ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে এবং ১০২ কোটি টাকা ডরিন পাওয়ারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে মোংলায় নির্মিতব্য ১০০ মেগাওয়াট প্রকল্পে ইক্যুইটি হিসেবে বিনিয়োগ করা হবে। এ ছাড়া সিটি ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণের আংশিক পরিশোধে ৬০ কোটি টাকা এবং সম্ভাব্য আইপিও ব্যয়ের জন্য ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
কোম্পানিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যাংকঋণ, পুঁজিবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থ, প্রেফারেন্স শেয়ার এবং শেয়ারহোল্ডারদের নিজস্ব বিনিয়োগের সমন্বয়ে প্রথম পর্যায়ের ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করা হবে। এ দুটি প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর প্রায় ৭৫ শতাংশ বা ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকা ব্যাংকঋণের মাধ্যমে সংগ্রহের প্রত্যাশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায় সৌরবিদ্যুতে ঝুঁকছে প্রতিষ্ঠানটি
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির চেয়ারম্যান ইমরান করিম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ এবং কোম্পানির বিদ্যমান ব্যবসায় বৈচিত্র্য আনতেই নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মূলত দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এবং আমাদের বিদ্যমান পোর্টফোলিও বাস্কেটে বৈচিত্র্য আনতেই নতুন করে ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
কনফিডেন্স এন্টারপ্রাইজেসের সঙ্গে যৌথভাবে আরও ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ইমরান করিম বলেন, ওই প্রকল্পে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির মালিকানা থাকবে ৪৯ শতাংশ।
তিনি বলেন, এই বিনিয়োগ বিদ্যুৎ খাতে কোম্পানির অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু হলে কোম্পানির আয় ও মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ইতিবাচক হবে।
ইমরান করিমের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে প্রতিবছর ৬ দশমিক ২ শতাংশ হারে বেড়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪১ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৪৮৪ মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত উৎপাদন এবং গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ এর চেয়ে অনেক কম। সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সিস্টেম লস বাদ দিলে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছায় প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।
ইমরান করিম বলেন, চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়াতে হবে। তবে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতি সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের বড় সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি।
২০৩৫ সালের মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ১৬০ মেগাওয়াটের লক্ষ্য
সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পাশাপাশি সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ১০ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে কোম্পানিটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানের ৩৯৩ মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ১৬০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই পরিকল্পনার মাধ্যমে শুধু ভারী জ্বালানি তেল বা এইচএফও-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধ না থেকে সৌরবিদ্যুৎ, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং জ্বালানি অবকাঠামোসমৃদ্ধ বহুমুখী জ্বালানি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে চায় কোম্পানিটি।
রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৯ সালে প্রথম ধাপ শেষে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ২০৩২ সালে দ্বিতীয় ধাপ শেষে সক্ষমতা ১ হাজার ৯৬০ মেগাওয়াট এবং ২০৩৫ সালে তৃতীয় ধাপ শেষে ২ হাজার ১৬০ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে দেশে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন ৩৩ শতাংশ কমেছে। জ্বালানি সরবরাহের এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে সম্প্রসারণ পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
জাতীয় গ্রিডে ৩৯৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি ২০১৯ সাল থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। চারটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোম্পানিটি কার্যক্রম পরিচালনা করে। এগুলো হলো কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া, কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুর, জোডিয়াক পাওয়ার চট্টগ্রাম এবং কনফিডেন্স অ্যান্ড ডরিন পাওয়ার।
প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সম্মিলিতভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩৯৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। এর মধ্যে বগুড়ার দুটি কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২২৬ মেগাওয়াট, রংপুর কেন্দ্রের ১১৩ মেগাওয়াট এবং চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ৫৪ মেগাওয়াট।
কোম্পানিটির এইচএফও-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ২০১৯ সালের মার্চ থেকে নভেম্বরের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসে। এসব কেন্দ্রের কার্যকাল ১৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, মালিকানা সংরক্ষণ ও পরিচালনার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করাই কোম্পানিটির মূল ব্যবসা।
ইমরান করিমের মতে, সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সম্পদের ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক বাজারমূল্য শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
সম্পদ ও মুনাফায় কোম্পানির আর্থিক চিত্র
কোম্পানির আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি।
শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ সুপারিশ না করে মুনাফা সংরক্ষণ করায় কোম্পানিটির রিটেইন্ড আর্নিংস বা সংরক্ষিত মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে, কোম্পানিটির মোট বকেয়া ব্যাংকঋণ ৮১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রকল্প অর্থায়নের জন্য কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া ৩০০ কোটি টাকা এবং কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুর ২৪১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এ কাশেম অ্যান্ড কোংয়ের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোম্পানিটির আয় হয়েছে ১ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৪৭৭ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে আয় ছিল ২ হাজার ৩৯৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং নিট মুনাফা ছিল ৪৮৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
কোম্পানিটির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বার্ষিক আয় বেড়ে ৩ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা ৯৭৬ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তবে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়ন নতুন প্রকল্পের অগ্রগতি, অর্থায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে, সৌরবিদ্যুৎ খাতে ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির ব্যবসায় বৈচিত্র্য আনার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ, ব্যাংকঋণ ও নিজস্ব বিনিয়োগের সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

