বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্বব্যাংকের অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পেতে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি

প্রকল্পের মেয়াদ সাত থেকে পাঁচ বছর এবং অনুমোদনের সময় ১৮ থেকে আট মাসে নামানোর পরিকল্পনা; ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক চূড়ান্ত করতে সম্মত বিশ্বব্যাংক

আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা পেতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল সাত বছর থেকে কমিয়ে পাঁচ বছর এবং প্রকল্প অনুমোদনের সময় ১৮ মাস থেকে কমিয়ে আট মাসে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা তুলে ধরেছে সরকার। পাশাপাশি বৈদেশিক অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করে পাঁচ মাসে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।

গতকাল ১৩ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর আনা বিয়ার্ডের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের শীর্ষ প্রতিনিধিদল এসব প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে। বৈঠকে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের নতুন ‘কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক’ (সিপিএফ) চূড়ান্ত করার বিষয়ে সম্মত হয় দুই পক্ষ।

অতিরিক্ত ঋণসহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আলোচনার অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি, কর্মসূচি এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সমঝোতা রয়েছে।

তবে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের বিষয়টি এখনো আলোচনাধীন। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

বৈঠকে উপস্থিত সরকারের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানান, বাংলাদেশকে ঋণসহায়তা দেওয়ার বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)—উভয় সংস্থার মনোভাব ইতিবাচক। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি নতুন কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে সরকার।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক খাত সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে দুই সংস্থাই বিভিন্ন শর্ত দিচ্ছে। এসব শর্ত সমন্বয় করে কীভাবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

চার অগ্রাধিকারকে ঘিরে নতুন অর্থায়ন পরিকল্পনা

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত অতিরিক্ত অর্থায়নের ভিত্তি হিসেবে ‘রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড রিফর্ম ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ (আরআরআইপি) নামে একটি কর্মসূচি তৈরি করা হয়েছে। এর লক্ষ্য জরুরি আমদানি নিশ্চিত করা, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করা, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সংস্কার আনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা বাড়ানো।

কর্মসূচিটির চারটি প্রধান অগ্রাধিকার হলো—

বাণিজ্য অর্থায়ন: জ্বালানি ও সারসহ জরুরি পণ্য আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা।

বাণিজ্য সহজীকরণ: ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের (এমএসএমই) বিকাশে সহায়তা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের কার্যক্রম সহজ করা।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সংস্কার: ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো।

অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি: বৈশ্বিক ও বাহ্যিক অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় সামষ্টিক অর্থনীতির সক্ষমতা জোরদার করা।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অতিরিক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে জ্বালানি ও সারে ভর্তুকির ব্যয় মেটানো, জরুরি পণ্য আমদানির সক্ষমতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় ব্যাংকগুলোকে পুনর্মূলধন জোগানোর ক্ষেত্রে সহায়তা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থেকে দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রধানমন্ত্রীর বৈঠনের পর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব

গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার ব্যাংককে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংকের কাছে আরআরআইপি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়।

অর্থমন্ত্রী এই অর্থায়ন উদ্যোগকে বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে লিখিত প্রস্তাব ও প্রাথমিক সুপারিশ আদান-প্রদান হয়েছে। তবে অর্থায়নের পরিমাণ, শর্ত ও বাস্তবায়ন কাঠামো চূড়ান্ত করতে আরও আলোচনা প্রয়োজন।

ব্যাংক খাত সংস্কার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ

বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের সংস্কার কর্মসূচিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ব্যাংক খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।

বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরে। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোর পুনর্মূলধনীকরণ এবং আমানতকারীদের আস্থা বজায় রাখতে বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকে অনিয়ম ও দুর্বলতা দূর করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে বলেও জানানো হয়।

পুঁজিবাজার ও কর প্রশাসনে সংস্কার

বৈঠকে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে স্বাধীন ও পেশাদার ভিত্তিতে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরে বাংলাদেশ। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় পরিবর্তন ও সংস্কারের ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। নিউইয়র্ক, লন্ডন ও হংকংয়ের তহবিল ব্যবস্থাপকদের মধ্যেও বাংলাদেশের বাজার নিয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। হংকং ইক্যুইটি ফান্ড-সংক্রান্ত অগ্রগতিও দ্রুত এগোচ্ছে বলে জানানো হয়।

এ ছাড়া আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘদিনের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনের কার্যক্রম আলাদা করার কথা বৈঠকে তুলে ধরা হয়। সম্পূর্ণ অটোমেশনের মাধ্যমে কর আদায় বাড়ানো এবং কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করার উদ্যোগও সরকারের সংস্কার পরিকল্পনার অংশ।

সব মিলিয়ে, অতিরিক্ত বৈদেশিক অর্থায়ন সংগ্রহের পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন দ্রুত করা, ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার। তবে বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা পেতে আলোচনা ও শর্ত নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন