রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মামলাজটে চট্টগ্রাম কাস্টমস, আটকে আড়াই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব

মামলাজটে থমকে আছে চট্টগ্রাম কাস্টমসের বিপুল পরিমাণ আমদানি পণ্য ও সরকারি রাজস্ব। চট্টগ্রাম কাস্টমসে চলমান প্রায় সাড়ে ১০ হাজার মামলায় আটকে আছে হাজার কোটি টাকার পণ্য। এসব মামলার কারণে সরকারের প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার রাজস্বও আটকে রয়েছে। এর মধ্যে অনেক মামলা দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টসহ বিভিন্ন বিচারিক আদালতে চলমান।

দীর্ঘদিন ধরে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় একদিকে সরকারি রাজস্ব আটকে আছে, অন্যদিকে আমদানিকারকদের পণ্য পড়ে থেকে বাড়ছে সংরক্ষণ ও ডেমারেজ খরচ। একই সঙ্গে মামলাগুলো পরিচালনায় কাস্টমসের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, বিপুলসংখ্যক মামলা পরিচালনার বিপরীতে বছরে বরাদ্দ মাত্র ২ লাখ টাকা। পাশাপাশি মামলা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জনবলও নেই।

চট্টগ্রাম কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু বলেন, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প উপায় খুঁজতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তবে সেই উদ্যোগে গতি না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।

অন্যদিকে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, অর্থ ও জনবল সংকটের পাশাপাশি বিচারিক কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালনা করতে হয়। কোনো পক্ষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়, সে কারণেই মামলাগুলোর নিষ্পত্তিতে সময় লাগছে।

১০ হাজারের বেশি মামলা

চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০ হাজার ৪৫৯টি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে হাইকোর্টে ৯ হাজার ২৮৩টি, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ১৬১টি, কাস্টমস-এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালে ৮৬৩টি এবং কমিশনার (আপিল) পর্যায়ে ১৪৮টি মামলা রয়েছে।

এসব মামলার কারণে আটকে থাকা পণ্যের আর্থিক মূল্য বিপুল। মামলাগুলোর কোনো কোনোটি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলায় পণ্য পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে কনটেইনার ডেমারেজ ও অন্যান্য খরচ।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আমদানি নীতি ও বিভিন্ন সংস্থার আইনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, এইচএস কোড-সংক্রান্ত জটিলতা, রাসায়নিক পরীক্ষা, ভুল ঘোষণা (ডিক্লারেশন)সহ বিভিন্ন কারণে মামলা তৈরি হচ্ছে। এসব মামলা দীর্ঘদিন নিষ্পত্তি না হওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

চার মাসে ১৫ লাখ টাকা খরচ, বন্ধের পথে কারখানা

চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর তরুণ শিল্প উদ্যোক্তা ইয়াসির আরাফাতের মালিকানাধীন একটি ছোট লবণ কারখানাও মামলাজটের কারণে সংকটে পড়েছে। চলতি বছরের মে মাসে পাকিস্তান থেকে প্রায় ৭ লাখ টাকা মূল্যের ২২ টন রক সল্ট আমদানি করেন তিনি। তবে আইনি জটিলতায় চালানটি আটকে যায়।

ইয়াসির আরাফাতের দাবি, গত চার মাসে মামলা ও জরিমানাসহ পণ্যটি ছাড়াতে তার প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এরপরও তিনি আমদানি করা লবণ হাতে পাননি। এতে তার কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং কয়েকজন কর্মীকে ছাঁটাই করতে হয়েছে।

ওয়ারদা অ্যান্ড জুবায়ের অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ইয়াসির আরাফাত বলেন, কাঁচামালের অভাবে তার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধের পথে। মামলার পেছনে এরই মধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। পণ্যের মূল্য, কনটেইনার ডেমারেজসহ তার মোট ব্যয় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকারও বেশি হয়েছে বলে জানান তিনি।

কয়েক হাজার কনটেইনার আটকে

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, মামলাজটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে কয়েক হাজার কনটেইনার পড়ে আছে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকা এসব পণ্য নিলামে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুত ও সমন্বিতভাবে পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে।

সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মো. গোলাম রব্বানি বলেন, কয়েক হাজার কনটেইনার পড়ে আছে। এসব পণ্য নিলামে ছাড়ার পাশাপাশি ব্যাংক গ্যারান্টিসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিষ্পত্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কাস্টমস ও চেম্বারের যৌথ উদ্যোগে একটি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু বলেন, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প একটি উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেটি আশানুরূপ গতিশীল হয়নি। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।

বছরে মাত্র ২ লাখ টাকা বরাদ্দ

চট্টগ্রাম কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ১০ হাজার মামলা পরিচালনার জন্য বছরে বরাদ্দ মাত্র ২ লাখ টাকা। মামলা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা জনবলও পর্যাপ্ত নয়; সংশ্লিষ্ট কাজে ৭ থেকে ৮ জনের মতো জনবল রয়েছে।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল বরাদ্দ দিলে মামলাগুলো দ্রুত পরিচালনা ও নিষ্পত্তির পাশাপাশি আটকে থাকা রাজস্ব আদায়ের সুযোগ তৈরি হবে।

প্রতিদিন গড়ে ২২০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের ওপর শুল্ক-কর আদায়ের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্বের বড় একটি অংশ আসে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে। ফলে আমদানি কার্যক্রম, পণ্যের মূল্য ও পরিমাণ এবং শুল্ক-কর আদায়ের ওপর কাস্টমসের রাজস্ব আয় অনেকটাই নির্ভরশীল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ১১ কোটি ২৫ লাখ টন পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়ে থাকে। হাই-স্পিড ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, পাম অয়েল, মোটরগাড়ি ও খুচরা যন্ত্রাংশ, ক্যাপিটাল মেশিনারি, ইস্পাত সামগ্রী এবং বিভিন্ন খাদ্যপণ্য থেকে কাস্টমসের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

এদিকে ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে এক মাসেই ৭ হাজার ৯২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। অর্থাৎ ওই মাসে দৈনিক গড়ে প্রায় ২২৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-আগস্টে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস মোট ১৪ হাজার ১৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ১২ হাজার ৯১৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১ হাজার ৯৯ কোটি ৩ লাখ টাকা, যা ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।

তবে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হলেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে কাস্টম হাউস। জুলাই-আগস্ট দুই মাসের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার ৫৩০ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৪ হাজার ১৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে ৭ হাজার ৫১২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৬ হাজার ৯২৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই মাসে আদায় হয়েছিল ৭ হাজার ৪২৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ফলে জুলাইয়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায় কমেছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

তবে আগস্টে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য গতি আসে। ২০২৫ সালের আগস্টে যেখানে ৫ হাজার ৪৮৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল, চলতি বছরের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ওই মাসে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১ হাজার ৬০২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বা ২৯ দশমিক ২০ শতাংশ।

‘বিচারিক প্রক্রিয়া আইনি কাঠামোর মধ্যেই করতে হয়’

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, রাজস্ব আদায়ে আগস্টের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক। এ ধারা অব্যাহত রাখতে কাস্টমসের কার্যক্রম আরও গতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলে এবং বর্তমান প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।

মামলাজটের বিষয়ে তিনি বলেন, কাস্টমসের আইন শাখা অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তবে বিচারিক প্রক্রিয়া নির্ধারিত আইন ও পদ্ধতি অনুসরণ করেই পরিচালনা করতে হয়। কোনো পক্ষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়, সে কারণে মামলাগুলোর নিষ্পত্তিতে সময় লাগছে।

তার ভাষ্য, কাস্টমসের অর্থ ও জনবল সংকট রয়েছে। এর পাশাপাশি বিচারিক কার্যক্রম চলমান থাকায় মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা সবসময় সম্ভব হয় না।

দেশের অন্যতম প্রধান রাজস্ব আহরণকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টমসের বিপুলসংখ্যক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হলে একদিকে আটকে থাকা পণ্য ও ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমবে, অন্যদিকে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্বও আদায়ের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন