বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় অ্যাফিলিয়েশন বিবেচনা করে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সিলেট সার্কিট হাউস মিলনায়তনে জেলা প্রশাসন আয়োজিত ‘জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়ন সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সিলেট অঞ্চলের সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানিদের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের সম্পূর্ণ নির্মোহ থাকার নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের পরিচয় অনেকেরই জানা রয়েছে। তাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো নিরীহ ব্যক্তিকে তালিকাভুক্ত করা যাবে না। একইভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো প্রকৃত অপরাধীকেও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।

আগামী এক মাসের মধ্যে এ নির্দেশনার দৃশ্যমান ফলাফল উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীতে ‘রিওয়ার্ড ও পানিশমেন্ট’ নীতি চালু করা হয়েছে। রেঞ্জ পুলিশ ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশকে (এসএমপি) এ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেন তিনি।

ঢালাও মামলায় নিরীহদের হয়রানি নয়

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-পরবর্তী বিভিন্ন মামলা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেক মামলার এজাহারে ৫০০, ১ হাজার কিংবা ২ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ভুক্তভোগী পরিবার মামলা না করে তৃতীয় পক্ষ মামলা করেছে। এর ফলে স্বার্থসিদ্ধি, ব্যবসায়ীদের হয়রানি কিংবা চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে মামলা দায়েরের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় প্রকৃত ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সিলেট রেঞ্জ ও মহানগর এলাকায় এ ধরনের মামলাগুলো পর্যালোচনার নির্দেশ দেন তিনি।

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী তদন্ত করে নিরীহ ও অযথা হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের মামলা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের দেনদরবার বা অনৈতিক লেনদেন যাতে না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি। তবে প্রকৃত অপরাধী ও নির্দেশদাতারা যেন কোনোভাবেই বাদ না পড়ে, তাও নিশ্চিত করতে বলেন।

বালি-পাথর কোয়ারি নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ

সিলেটের বালি ও পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় সৃষ্ট পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবের বিষয়েও সভায় কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, পরিবেশ সুরক্ষা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাঁর নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি কাজ করছে।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং আদালতের নির্দেশনা সমন্বয় করে প্রস্তুত করা কার্যবিবরণী অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এ-সংক্রান্ত মামলার দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত আইনি জটিলতা নিরসনের নির্দেশ দেন।

সীমান্ত এলাকায় পাহাড়ি ঢলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও পরিবেশের ক্ষতি রোধে মনিটরিং টিমের মাধ্যমে সার্বিক তদারকি জোরদারেরও আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

‘মব’ সংস্কৃতি সহ্য করা হবে না

দাবিদাওয়া আদায়ের নামে ‘মব’ বা অরাজকতা সৃষ্টির প্রবণতা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সড়ক অবরোধ বা কোনো প্রতিষ্ঠান ঘেরাও না করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দাবি উপস্থাপন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্মারকলিপি দেওয়া কিংবা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরার পরামর্শ দেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে ‘মব’-সংক্রান্ত ঘটনা ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে। সিলেট অঞ্চলকেও সম্পূর্ণ ‘মবমুক্ত’ রাখার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকার নির্দেশ

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেটকে মাদকমুক্ত করতে পুলিশ প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সক্ষমতা প্রদর্শনের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, সাধারণ মাদকসেবীদের পেছনে না ছুটে শীর্ষ মাদক কারবারিদের শনাক্ত করতে হবে। এ জন্য অন্তত ৫০ জন শীর্ষ মাদক কারবারির একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রস্তুত করে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার নির্দেশনা দেন তিনি।

এ ছাড়া সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) লজিস্টিক সংকট দূর করা, নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং পর্যাপ্ত যানবাহন সরবরাহের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে প্রতিটি পুলিশ ইউনিটকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

মতবিনিময় সভায় সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মালেক, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান এবং বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বক্তব্য দেন।

এ সময় সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম, জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন, পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেকসহ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভা সঞ্চালনা করেন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকী সাহা।

সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার, অপরাধীদের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন