মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হরমুজ ঘিরে ফের মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, পাল্টাপাল্টি হামলায় বাড়ছে উত্তেজনা

কয়েক সপ্তাহের আপেক্ষিক সামরিক নীরবতার পর আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। হরমুজ প্রণালীতে মাইন স্থাপনের প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে এক মাসেরও বেশি সময় পর সোমবার মধ্যরাতে পরস্পরকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে দুই দেশ। এতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাও নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন, ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি রকেট লঞ্চার লক্ষ্য করে মার্কিন বাহিনী সীমিত ও নির্ভুল হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সামরিক পর্যবেক্ষকদের দাবি, ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে সমুদ্র মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বেসামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় ওই হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সেন্টকম।

তবে ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর আব্বাসের কাছে হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনায় সামরিক সদস্য ও বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন।

মার্কিন হামলাকে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘কৌশলগত ও প্রাণঘাতী ভুল’ হিসেবে অভিহিত করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এর জবাবে জর্ডানে অবস্থিত দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান।

তবে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী সোমবার (৩১ আগস্ট) জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। বেসামরিক মানুষের জীবন ও সম্পদের ওপর কোনো প্রভাব পড়ার আগেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটি।

হরমুজ ঘিরে নতুন উত্তেজনা

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের উত্তেজনা দীর্ঘদিনের। সামরিক সংঘাতের নতুন এই পর্বে প্রণালীটির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীকে মাইনমুক্ত করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। একই সঙ্গে সেখানে পুনরায় মাইন স্থাপনের চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্ট নৌযান বা জাহাজ ধ্বংস করার হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি।

সর্বশেষ সামরিক উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯০ দশমিক ৫৭ ডলারে এবং মার্কিন ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৮৫ দশমিক ৬৪ ডলারে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব তেলের দামসহ বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

কূটনৈতিক উদ্যোগও অব্যাহত

সামরিক উত্তেজনা বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। দুই দেশের সরাসরি আলোচনা বর্তমানে স্থবির থাকলেও ওমানের মধ্যস্থতায় সমুদ্র যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে ইরানের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশও এ প্রচেষ্টায় সমর্থন দিচ্ছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর নীতিতে জোর দিচ্ছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়াতে প্রতি সপ্তাহে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞার প্রাথমিক লক্ষ্য হবে ইরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে সহযোগিতা করা বিভিন্ন দেশের ব্যাংক।

ফলে সামরিক হামলা, পাল্টা হামলা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের বিরোধ আবারও নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যেকোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন