রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬

ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ: কী আছে ট্রাম্পের ‘ঐতিহাসিক’ চুক্তিতে?

১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্র ঘিরে ওয়াশিংটন-কারাকাস সমঝোতা; ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রত্যাশা ভেনেজুয়েলার, তবে মালিকানা ও বাস্তবায়ন নিয়ে রয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলভান্ডারের অধিকারী ভেনেজুয়েলার বিপুল জ্বালানি সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে একটি বড় ধরনের চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্রে থাকা ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। তবে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলতে ঠিক কী ধরনের মালিকানা, উৎপাদন অধিকার বা বাণিজ্যিক কর্তৃত্ব বোঝানো হচ্ছে—তার পূর্ণ আইনি ও আর্থিক কাঠামো এখনো প্রকাশ্যে পরিষ্কার নয়।

ট্রাম্প চুক্তিটিকে বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন বাজারে জ্বালানির দাম কমাতে সহায়তা করবে।

অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলছেন, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেই বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বিপর্যস্ত তেলশিল্প পুনর্গঠন করা হবে।

কত তেল রয়েছে এই চুক্তির আওতায়?

ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ বলে বিবেচিত। নতুন চুক্তিতে আলোচিত ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল সেই মোট মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

এই সম্পদ ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। ভেনেজুয়েলা আরও আটটি নতুন তেল ব্লক উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।

প্রাথমিকভাবে উৎপাদন দৈনিক প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। বর্তমানে দেশটির উৎপাদন এর চেয়ে কম। একসময় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদকদের একটি হলেও দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি, অবকাঠামোর অবনতি, ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলার উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র কী পাচ্ছে?

ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি তেলসম্পদে প্রবেশাধিকার দেবে এবং মার্কিন বেসরকারি কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্র উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ভেনেজুয়েলার মাটির নিচের ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় মজুত হয়ে যাচ্ছে—বিষয়টি এতটা সরল নয়।

বরং প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এটি নির্দিষ্ট তেলক্ষেত্রের উন্নয়ন, উৎপাদন ও উৎপাদিত তেলের ওপর বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ বা অংশীদারত্বের ব্যবস্থা। চুক্তির বিস্তারিত নথি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত মালিকানা কাঠামো ও পক্ষগুলোর অধিকার পুরোপুরি নির্ধারণ করা কঠিন।

ভেনেজুয়েলার লাভ কী?

কারাকাসের প্রত্যাশা, এই চুক্তির মাধ্যমে দেশটির দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ-সংকটে থাকা তেলশিল্পে বিপুল বিদেশি মূলধন ও প্রযুক্তি প্রবেশ করবে।

রদ্রিগেজ সরকারের হিসাবে, প্রকল্পগুলো থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ আসতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ভেনেজুয়েলা প্রায় ২০৯ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব পেতে পারে।

সরকারের আশা, পুরোনো তেলক্ষেত্র ও অবকাঠামো আধুনিকায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এই বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ভেনেজুয়েলা বহু বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকট, বিনিয়োগের অভাব এবং ব্যাপক জনঅভিবাসনের সমস্যায় রয়েছে। ফলে দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ তেলশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেন এখন এই চুক্তি?

চুক্তিটির সময়ও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব জ্বালানি বাজার বর্তমানে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জীবনযাত্রার ব্যয় ও পেট্রলের দাম ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক বিবেচনার বিষয়।

এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদে দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশাধিকারকে ওয়াশিংটন জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবেও তুলে ধরছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা সম্পর্কে এত বড় পরিবর্তন কেন?

দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক ইতিহাস অত্যন্ত সংঘাতপূর্ণ।

দীর্ঘদিন ভেনেজুয়েলার ক্ষমতায় থাকা নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক ছিল তীব্র বৈরিতাপূর্ণ। নির্বাচন, মানবাধিকার, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মাদক পাচারের অভিযোগ এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দুই দেশের বিরোধ ক্রমেই গভীর হয়।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বর্তমানে নিউইয়র্কে মাদক ও অস্ত্র-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন এবং অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এরপর মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব নেন। তাঁর সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক দ্রুত পরিবর্তিত হয় এবং জ্বালানি খাতে বিদেশি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ শুরু হয়।

বর্তমান তেল চুক্তি সেই পরিবর্তিত সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলোর একটি।

চুক্তি নিয়ে বিতর্ক কেন?

সমালোচকদের প্রধান প্রশ্ন—একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অন্য একটি রাষ্ট্রের এত বড় মাত্রার ‘নিয়ন্ত্রণ’ কীভাবে কার্যকর হবে এবং এর আইনি ভিত্তি কী?

আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থায়ী সার্বভৌমত্ব একটি স্বীকৃত নীতি। ভেনেজুয়েলা সরকারও বলছে, নতুন ব্যবস্থায় দেশের সম্পদের ওপর তার সার্বভৌম অধিকার বহাল থাকবে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক হস্তক্ষেপ এবং এরপর এত বড় তেল চুক্তি হওয়ায় সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন—সমঝোতাটি কতটা সমান অবস্থান থেকে হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার ভেতরেও চুক্তির বিরোধিতা দেখা গেছে। বিরোধীদের পাশাপাশি সাবেক সরকারপন্থী কিছু ব্যক্তিও এর স্বচ্ছতা, সাংবিধানিক বৈধতা এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি PDVSA-এর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

চুক্তি হলেই কি দ্রুত তেল উৎপাদন বাড়বে?

তা নিশ্চিত নয়।

ভেনেজুয়েলার কাছে বিপুল তেলের মজুত থাকলেও এর বড় অংশ উত্তোলন করা প্রযুক্তিগতভাবে জটিল এবং ব্যয়বহুল। বহু বছরের কম বিনিয়োগে দেশটির তেলক্ষেত্র, পাইপলাইন, শোধনাগার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ফলে কাগজে ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের সম্পদ থাকলেও তা দ্রুত বাজারে আনা সম্ভব হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রয়োজন হবে বিপুল বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও আইনি স্থিতিশীলতা।

কতদিনের জন্য এই চুক্তি?

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সর্বশেষ বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতার এই চুক্তির মেয়াদ ২৫ বছর।

তবে প্রকল্পভিত্তিক বিভিন্ন চুক্তি, উৎপাদন অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শর্ত আলাদা হতে পারে। পূর্ণাঙ্গ চুক্তিপত্র প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এসব বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।

সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

এই চুক্তি শুধু একটি বাণিজ্যিক তেল চুক্তি নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা সম্পর্কের বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ওয়াশিংটনের জন্য এতে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ, মার্কিন কোম্পানির নতুন বিনিয়োগের সুযোগ এবং পশ্চিম গোলার্ধে কৌশলগত প্রভাব বাড়ানোর সম্ভাবনা। অন্যদিকে কারাকাস চাইছে বিদেশি মূলধন ও প্রযুক্তির মাধ্যমে তেল উৎপাদন বাড়িয়ে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে।

তবে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে এর আইনি কাঠামো, বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—ভেনেজুয়েলা তার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব কতটা বজায় রাখতে পারে তার ওপর।

সূত্র: Reuters, Associated Press এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন