সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬

হিমালয়ে মহাপ্রলয়: নেপাল-তিব্বতে মৃত্যু ৭৯৭, নিখোঁজ ৩ হাজারের বেশি

হিমবাহ ধসে বরফ-পাথর-কাদার সুনামিসদৃশ স্রোতে নিশ্চিহ্ন জনপদ • জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শত শত শ্রমিকের খোঁজ নেই • টানেলে চলছে প্রাণের সন্ধান • মর্গে জায়গা না থাকায় ডিএনএ নমুনা রেখে অশনাক্ত মরদেহ দাফন • নতুন হ্রদ ঘিরে দ্বিতীয় বিপর্যয়ের শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

হিমালয়ের বুক থেকে নেমে আসা বরফ, পাথর, কাদা ও পানির ভয়ংকর স্রোত কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে দিয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকার চিত্র। কোথাও গোটা জনপদ ভেসে গেছে, কোথাও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো। পাহাড়ি নদীর প্রবল স্রোতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বহু এলাকা। দুর্যোগের কয়েক দিন পরও হাজারো মানুষের কোনো সন্ধান মিলছে না। হাসপাতাল ও উদ্ধারকেন্দ্রে স্বজনদের অপেক্ষা এখন একটাই—প্রিয় মানুষটি জীবিত ফিরবেন, নাকি অশনাক্ত মরদেহের ছবিতে তাঁকে খুঁজতে হবে।

হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও চীনের তিব্বতে অন্তত ৭৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো ৩ হাজার ৪৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার হিমালয়ের উঁচু অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ পানির সঙ্গে পাহাড়ি নদীপথে নেমে আসে। সুনামির মতো শক্তিশালী সেই স্রোত নেপালের বিভিন্ন গ্রাম ও শহরের ওপর আঘাত হানে। সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বতেও ঘটে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ।

নেপালেই মৃত্যু ৭৮১

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের রোববারের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা ৭৮১ জনে পৌঁছেছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ২ হাজার ৫০২ জন।

অন্যদিকে চীনের হিসাবে, তিব্বতে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। দুই অঞ্চল মিলিয়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে।

নিখোঁজদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটক, তীর্থযাত্রী এবং বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক রয়েছেন। তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতের উদ্দেশে যাওয়া পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদেরও একটি অংশের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

বন্যার স্রোত এতটাই প্রবল ছিল যে কিছু মরদেহ নেপালের সীমানা অতিক্রম করে নদীপথে ভারতের ভূখণ্ড পর্যন্ত ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নিখোঁজ ৯৩৩ শ্রমিক

নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো এখন উদ্ধার অভিযানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। দেশটিতে নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত অন্তত ৯৩৩ শ্রমিক রয়েছেন।

বিশেষ করে হিমালয়ের নদী উপত্যকায় অবস্থিত ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে শ্রমিক আটকে থাকার আশঙ্কায় সেখানে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।

নেপালি সেনাবাহিনীর সদস্য ও প্রকৌশলীরা ভারী ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে টানেল পর্যন্ত পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। উদ্ধারকারীরা এরই মধ্যে টানেলের ভেতরে একটি পাইপ প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়েছেন।

তবে প্রতিকূল আবহাওয়া উদ্ধার অভিযানকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। রোববার রাতভর বৃষ্টি এবং নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় খনন করা অংশে পানি ঢুকে পড়ে। একপর্যায়ে উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে এলে আবার অভিযান শুরু করা হয়।

‘প্রচণ্ড শব্দের পর দেখি সব কাদা-পানির নিচে’

দুর্যোগ থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের বর্ণনায় উঠে আসছে ঘটনার ভয়াবহতা।

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের ৩৩ বছর বয়সী সুরেন্দ্র দৌলুরি আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করছিলেন। দুর্যোগের চার দিন পর কাঠমান্ডুতে তিনি এএফপিকে জানান, প্রথমে তাঁরা প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পান। এরপর মুহূর্তের মধ্যেই প্রকল্পের টারবাইন ফ্লোর কাদা ও পানিতে ডুবে যায়।

সেখানে ছয় শ্রমিক আটকা পড়েছিলেন। সহকর্মীরা পাঁচজনকে উদ্ধার করতে পারলেও একজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

অন্য শ্রমিকদের কেউ কেউ দ্রুত উঁচু জায়গায় উঠতে পেরেছিলেন। আবার কেউ নির্মাণাধীন স্থাপনার এমন অংশে আশ্রয় নেন, যেখানে পানির ভয়ংকর স্রোত পৌঁছাতে পারেনি।

হিমবাহ ধস থেকেই বিপর্যয়ের শুরু

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, হিমবাহ ধস থেকেই এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের সূত্রপাত। বিপুল পরিমাণ বরফ, পানি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে পাহাড়ি নদীপথে নেমে আসায় প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয়।

উঁচু পাহাড় থেকে সরু নদী উপত্যকা দিয়ে নিচে নামার সময় এই স্রোতের গতি ও ধ্বংসক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। ফলে এর সামনে থাকা বসতি ও অবকাঠামোর বড় অংশই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দুর্যোগের পর পাহাড়ি এলাকায় পানি ও ধ্বংসাবশেষ আটকে কয়েকটি নতুন হ্রদও সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো এখন উদ্ধারকারীদের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ।

প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এসব বাঁধ ভেঙে গেলে আবারও আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। ফলে উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি নতুন হ্রদগুলোর পানির স্তর ও স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বত সীমান্তের একটি বন্দর এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধসের পর নতুন একটি হ্রদ সৃষ্টি হওয়ায় সেখানে কর্মরত চীনা উদ্ধারকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

মর্গে জায়গা নেই, শুরু হয়েছে দাফন

প্রাণহানির ব্যাপকতা নেপালের হাসপাতাল ও মর্গ ব্যবস্থাকেও বড় সংকটের মুখে ফেলেছে।

একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় অনেক মর্গের ধারণক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত হিমায়িত সংরক্ষণব্যবস্থাও নেই। এ কারণে পরিচয় শনাক্তকরণের পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কিছু অশনাক্ত মরদেহ দাফন শুরু করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

তবে ভবিষ্যতে পরিচয় নিশ্চিত করার সুযোগ রাখতে মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

পরবর্তী সময়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের ডিএনএর সঙ্গে এসব নমুনা মিলিয়ে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হবে। পরিচয় নিশ্চিত হলে পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হবে, যাতে তারা নিজ নিজ ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করতে পারেন।

এলইডি পর্দায় প্রিয়জনকে খুঁজছেন স্বজনরা

দুর্যোগের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য এখন মরদেহ শনাক্তকেন্দ্রগুলোতে।

নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে প্রতিদিন সেখানে জড়ো হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। উদ্ধার করা অশনাক্ত মরদেহের ছবি বড় এলইডি পর্দায় একের পর এক দেখানো হচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা সেই ছবিগুলোর মধ্যে খুঁজছেন বাবা-মা, সন্তান, ভাই-বোন কিংবা জীবনসঙ্গীকে।

অনেক মরদেহ দীর্ঘ সময় কাদা-পানি ও ধ্বংসাবশেষের মধ্যে থাকায় শুধু ছবি দেখে পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মরদেহের ছবি সহ্য করতে না পেরে অনেক স্বজনকে চোখ বন্ধ করে ফেলতে হচ্ছে।

একদিকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা, অন্যদিকে মরদেহ শনাক্ত করার আতঙ্ক—এই দুই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে হাজারো পরিবারের।

সময়ের সঙ্গে লড়ছেন উদ্ধারকারীরা

দুর্যোগের পর কয়েক দিন পেরিয়ে যাওয়ায় ধ্বংসস্তূপ বা টানেলের ভেতর থেকে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে। তারপরও আশা ছাড়ছেন না উদ্ধারকারীরা।

সেনাবাহিনী, প্রকৌশলী ও জরুরি উদ্ধারকারী দল দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, নদী উপত্যকা, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ধ্বংসস্তূপে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু উদ্ধারকারীদের সামনে এখন একসঙ্গে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ—অব্যাহত বৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি, অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢাল, নতুন করে তৈরি হওয়া হ্রদ এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ নিখোঁজ মানুষের বিপুল সংখ্যা। তিন হাজারের বেশি মানুষের ভাগ্য এখনো অজানা থাকায় মৃতের সংখ্যা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

হিমালয়ের এই বিপর্যয় তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি এখন হাজারো পরিবারের স্বজন হারানোর বেদনা, বেঁচে ফেরার অপেক্ষা এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া জনপদ পুনর্গঠনের এক দীর্ঘ মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

সূত্র: এএফপি, নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, নেপালি সেনাবাহিনী, চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও ইউএসজিএস।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন