সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ, চীন সফরের আমন্ত্রণ

৩০ চীনা কোম্পানির ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা; এক লাখ কর্মসংস্থান, তিস্তা প্রকল্প, ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। সাক্ষাতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছা জানান তিনি। একই সঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে রাষ্ট্রপতিকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান রাষ্ট্রদূত।

রোববার দুপুরে বঙ্গভবনে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম বিকেলে সাক্ষাতের বিস্তারিত জানান।

বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি চীনা বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, কৃষিপণ্য রপ্তানি, জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সংলাপ, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের অগ্রগতি তুলে ধরলেন রাষ্ট্রদূত

সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও অগ্রগতি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন ইয়াও ওয়েন।

রাষ্ট্রদূত জানান, সফরের অংশ হিসেবে চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, মোংলা বন্দর আধুনিকায়নে বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং মোংলা এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠায় সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরকে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করে আশা প্রকাশ করেন, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে এবং দুই দেশের সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।

৩০ চীনা কোম্পানির ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা

সাক্ষাতে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, অন্তত ৩০টি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে।

এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে অন্তত এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে জানান তিনি।

বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে শিল্পায়ন, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর খাতে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা গুরুত্ব পায়।

তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা

বৈঠকে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

দুই পক্ষ প্রকল্পটির পাশাপাশি বাংলাদেশ ও চীনের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে মতবিনিময় করে।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ ও নদী পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিস্তা প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের আলোচনায় রয়েছে।

কৌশলগত সংলাপ ও ‘টু প্লাস টু’ উদ্যোগ

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা যোগাযোগ আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার বিষয়ও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে।

দুই পক্ষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ দ্রুত শুরু করার বিষয়ে আলোচনা করে।

একই সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ে ‘টু প্লাস টু’ কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা সংলাপ চালুর উদ্যোগ নিয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

এ ধরনের সংলাপ চালু হলে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়মিত আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে।

চীনের বাজারে কাঁঠাল, আম ও পেয়ারা রপ্তানি

দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে।

বাংলাদেশ থেকে চীনের বাজারে কাঁঠাল, আম ও পেয়ারা রপ্তানির প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের জন্য চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো গেলে দুই দেশের বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে বৈঠকে মত প্রকাশ করা হয়।

সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক গাড়ি সংযোজন কারখানা

বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন শিল্পে চীনা সহযোগিতার সম্ভাবনাও আলোচনায় স্থান পায়।

বিশেষ করে সৌরশক্তি খাতে সহযোগিতা এবং দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহন সংযোজন কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে দুই পক্ষ আলোচনা করে।

চীন বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক উৎপাদক। এসব খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও শিল্প স্থাপিত হলে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থনৈতিক করিডোর ও আঞ্চলিক যোগাযোগ

চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে।

আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে এই করিডোরের সম্ভাবনা নিয়ে দুই পক্ষ মতবিনিময় করে।

অবকাঠামো, বাণিজ্য ও আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।

রোহিঙ্গা সংকটে সহযোগিতা জোরদারের আলোচনা

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়েও রাষ্ট্রপতি ও চীনা রাষ্ট্রদূতের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়ে আসছে। মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে বেইজিংয়ের ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

সাক্ষাতে এ সংকট মোকাবিলায় দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত রাখা ও আরও কার্যকর করার বিষয়ে মতবিনিময় হয়।

রাষ্ট্রপতির আগের চীন সফরের স্মৃতিচারণ

সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অতীতের চীন সফরের কথাও স্মরণ করেন।

মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত দুই দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেন।

রাষ্ট্রপতি ও চীনা রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ ও চীনের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার বিষয়ে একমত হন।

বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, কৃষি, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কূটনীতি ও প্রতিরক্ষাসহ বহুমাত্রিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।

সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির জন বিভাগের সচিব ও সামরিক সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন