রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশিদের জন্য ফের খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, কম খরচে কর্মী পাঠানোয় জোর

দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর দুই দেশ স্বচ্ছ, ন্যায্য ও কম খরচের অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, নতুন ব্যবস্থায় কর্মী নিয়োগে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমানো এবং কর্মীদের ওপর অভিবাসন ব্যয়ের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হবে।

গত ২২ জুন মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল তারেক রহমানের প্রথম দ্বিপক্ষীয় সরকারি বিদেশ সফর। বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি মানবসম্পদ ও বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

শ্রমবাজার দ্রুত খোলার অনুরোধ বাংলাদেশের

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান তারেক রহমান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি কর্মী নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার জন্য মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বৈঠকের পর দুই দেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অভিবাসী কর্মীদের শোষণ ও হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং কর্মীবান্ধব করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও বিদেশি কর্মীদের দেশটির অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে কর্মী নিয়োগকে কেন্দ্র করে অতীতে তৈরি হওয়া অনিয়ম ও মানবিক সমস্যাগুলো বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

মধ্যস্বত্বভোগী কমিয়ে স্বচ্ছ নিয়োগ

নতুন ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে কর্মী নিয়োগে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা ও প্রভাব কমানো। অতীতে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় যেতে অনেক কর্মীকে উচ্চ অভিবাসন ব্যয় বহন করতে হয়েছে। অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেক কর্মী ঋণ নিয়ে বিদেশে গিয়ে দীর্ঘ সময় আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েছেন।

এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে দুই দেশ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী করার বিষয়ে কাজ করছে।

এর আগেও বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় প্রযুক্তিনির্ভর কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি সামনে আসে। মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘Employer Pays’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মী নিয়োগের ব্যয় নিয়োগকর্তার বহনের ব্যবস্থা তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে বাংলাদেশি কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার সুযোগ তৈরি হবে।

বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কর্মীদের ওপর নিয়োগ ব্যয়ের বোঝা না চাপিয়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শ্রমবাজার পুনরায় চালুর পর প্রাথমিক পর্যায়ে বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে।

তবে প্রথম ধাপে ঠিক কতজন কর্মী এ সুবিধায় মালয়েশিয়ায় যাবেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দুই দেশের চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা ও বাস্তবায়ন কাঠামোই নির্ধারক হবে।

কর্মী নির্বাচন, নিয়োগকর্তার চাহিদা, কোন কোন খাতে কর্মী নেওয়া হবে, নিয়োগ ব্যয় কে বহন করবে এবং অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ভূমিকা কী হবে—এসব বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পর নতুন ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।

দক্ষ কর্মী পাঠানোতেও গুরুত্ব

শুধু শ্রমবাজার পুনরায় খোলাই নয়, মালয়েশিয়ার শিল্প ও ব্যবসা খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ কর্মী তৈরির বিষয়েও দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতার স্বীকৃতি ও সনদ প্রদান এবং দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময় বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের কর্মীদের যোগ্যতার আরও কার্যকর সমন্বয় করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অনিয়ম ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের গন্তব্য। তবে অতীতে কর্মী নিয়োগে অতিরিক্ত ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, নির্দিষ্ট এজেন্সিনির্ভর নিয়োগ ব্যবস্থা এবং চাকরির নিশ্চয়তা ছাড়াই কর্মী পাঠানোর মতো অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

এ কারণে এবার শ্রমবাজার চালুর ক্ষেত্রে শুধু কতজন কর্মী যাবেন, তার চেয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও ব্যয়সাশ্রয়ী হবে—সেটিকেই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ উভয় পক্ষই কর্মী নিয়োগে শোষণ বন্ধ, মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমানো এবং কর্মী ও তাদের পরিবারের স্বার্থ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।

নতুন সুযোগের অপেক্ষায় বাংলাদেশি কর্মীরা

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুরোপুরি সচল হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে নিয়োগ ব্যয় নিয়োগকর্তা বহন করার ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বিদেশ যেতে আগ্রহী কর্মীদের জন্য এটি বড় পরিবর্তন হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের পর শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক পর্যায়ের সমঝোতা এ প্রক্রিয়ায় নতুন গতি দিয়েছে।

এখন নজর থাকবে নতুন নিয়োগ ব্যবস্থা বাস্তবে কবে থেকে কার্যকর হয়, কোন কোন খাতে কত কর্মী নেওয়া হয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—বাংলাদেশি কর্মীরা সত্যিই কতটা কম বা বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, তার ওপর।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন