বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬

শত বছরের মধ্যে কলম্বিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত ২৪১, ধ্বংসস্তূপে চলছে মরিয়া উদ্ধার অভিযান

শত বছরের মধ্যে কলম্বিয়ায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটির পর দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) পেরেইরা, কালি ও আশপাশের এলাকায় ধসে পড়া আবাসিক ও অফিস ভবনের ধ্বংসস্তূপে জীবিতদের সন্ধান চালিয়েছেন উদ্ধারকর্মী, সেনাসদস্য, দমকলকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা। সর্বশেষ হিসাবে ভূমিকম্পে অন্তত ২৪১ জন নিহত এবং ১ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। 

৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে পশ্চিম কলম্বিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর কয়েকটিতে ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে, সড়ক ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। 

ধ্বংসস্তূপে জীবনের সন্ধান

ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজে ক্রেন, ভারী যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত কুকুর ও আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে হাত লাগিয়েছেন। অনেক জায়গায় স্বেচ্ছাসেবীরা মানবশৃঙ্খল তৈরি করে হাতে হাতে ইট, কংক্রিট ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষকে খুঁজছেন।

উদ্ধারকারীরা নিয়মিত কাজ থামিয়ে ধ্বংসস্তূপের দিকে ডাক দিচ্ছেন, যাতে ভেতরে কেউ জীবিত থাকলে তার সাড়া পাওয়া যায়। কোথাও শিস, টোকা কিংবা ক্ষীণ কোনো শব্দ পাওয়া গেলে সেই জায়গাকে ঘিরে সতর্কতার সঙ্গে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।

এমনই এক অভিযানে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। ৩২ বছর বয়সী ওই নারীকে উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস দেখা যায়। 

পরিবার নিয়ে পার্কে রাত

ভূমিকম্প ও পরাঘাতের আতঙ্কে বহু মানুষ নিজেদের বাড়িতে ফিরতে সাহস করছেন না। যেসব ভবন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলোর বাসিন্দারাও নিরাপত্তার কারণে বাইরে অবস্থান করছেন।

পেরেইরার বিভিন্ন পার্ক ও খোলা জায়গা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে তাঁবু, গদি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে অবস্থান করছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

অনেকের কাছে এই ভূমিকম্প শুধু ঘরবাড়ি হারানোর ঘটনা নয়—দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, সম্পদ ও জীবিকা হারানোর শোকও বয়ে এনেছে। কেউ নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে ধ্বংসস্তূপের পাশে অপেক্ষা করছেন, আবার কেউ অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যাওয়ার পর পরিবারকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছেন।

হাসপাতালে চাপ, রোগী সরিয়ে চিকিৎসা

ভূমিকম্পে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও বড় চাপ তৈরি হয়েছে। কালির একটি হাসপাতালের ভবনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রোগীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়। হাসপাতালের কিছু সেবা খোলা জায়গা ও পার্কিং এলাকায় পরিচালনা করতে হয়েছে।

ধসে পড়া অংশগুলোর মধ্যে শিশু, অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা ও নবজাতক সেবার কয়েকটি তলাও ছিল। ফলে হাসপাতালটির রোগী ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষ উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে লড়াই

উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে কঠিন অংশ চলছে ধসে পড়া ভবনগুলোর ভেতরে। বেঁকে যাওয়া কংক্রিটের কাঠামো এবং বেরিয়ে থাকা ইস্পাতের কারণে যেকোনো ভুল পদক্ষেপে আরও ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে উদ্ধারকারীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একেকটি অংশ সরাচ্ছেন। প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে জীবিত মানুষের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনো সম্ভাব্য সংকেত পাওয়া গেলে ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার বন্ধ রেখে হাতে হাতে ধ্বংসাবশেষ সরানো হচ্ছে।

স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরাও উদ্ধারকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অনেক জায়গায় সেনা ও দমকলকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে অংশ নিয়েছেন।

হাজারো মানুষের সহায়তার হাত

ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ পানি, খাবার, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে দুর্গত এলাকায় পৌঁছাচ্ছেন। রক্তদানের কেন্দ্রগুলোতেও মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।

একজন রক্তদাতা বলেন, নিজের শহর ও দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ থেকেই তারা রক্ত দিতে এসেছেন।

জরুরি অবস্থা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা

ভূমিকম্পের ভয়াবহতার মধ্যে কলম্বিয়া সরকার জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য অস্থায়ী আবাসন ও আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জরুরি সহায়তা হিসেবে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকেও সহায়তা ও সমর্থনের প্রস্তাব এসেছে।

পরাঘাতের শঙ্কা

প্রধান ভূমিকম্পের পর পশ্চিম কলম্বিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পরাঘাত অব্যাহত রয়েছে। এতে ধসে পড়া বা দুর্বল হয়ে যাওয়া ভবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে উদ্ধারকারীদের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

তবু ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত থাকার সম্ভাবনা থাকায় অভিযান থামানো হয়নি। উদ্ধারকারীরা প্রতিটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে শব্দ, শিস বা অন্য কোনো জীবনের সংকেত পাওয়ার আশায় তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন।

সর্বশেষ পরিস্থিতিতে, ২৪১ জনের প্রাণহানি ও ১ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষের আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। 


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন