মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ছাড়া ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়: নাহিদ ইসলাম

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ কয়েকটি বিষয়ে সমাধান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

তিনি অভিযোগ করেছেন, ভারত তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিয়ে আসছে। তার দাবি, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, বিচারব্যবস্থা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি অবমাননা।

সোমবার (১০ আগস্ট) দিবাগত রাত ১টা ৫ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বাংলা ও ইংরেজিতে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন।

‘প্রত্যর্পণ প্রশ্নের সমাধান ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়’

নাহিদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নের সমাধান না করে ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগ বাংলাদেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

তার অভিযোগ, গত দুই বছর ধরে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিও অবমাননা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনার কথিত সংবাদ সম্মেলনের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের আপত্তি উপেক্ষা করে ওই আয়োজনের মধ্য দিয়ে ভারতের বাংলাদেশ-সম্পর্কিত নীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে তিনি মনে করেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

নাহিদ ইসলাম বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

তার ভাষ্য, দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক কার্যক্রমের পর বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু এর মাধ্যমে বিষয়টির কার্যকর কূটনৈতিক সমাধান বা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জবাবদিহি আদায় করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন একটি বিষয়ে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি দৃশ্যমান ও কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ নিয়েও প্রশ্ন

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক সাক্ষাতের প্রসঙ্গও তার পোস্টে তুলে ধরেছেন এনসিপির আহ্বায়ক।

তিনি বলেন, ওই বৈঠকে ৫ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো বক্তব্য, ব্যাখ্যা কিংবা ভারতের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি। তার মতে, বাংলাদেশের জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি উচ্চপর্যায়ের ওই বৈঠকে যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়া হতাশাজনক।

ভারতীয় হাইকমিশনারের কথিত ‘shared dream’ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের জনগণ এমন কোনো সম্পর্কের অংশীদার হতে চায় না, যেখানে কোনো দেশ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ বা তাতে প্রভাব বিস্তারের অধিকার দাবি করবে।

‘সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক চাই’

নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দক্ষিণ এশিয়া চায়, যেখানে গণতন্ত্র, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি থাকবে।

তার মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে; কোনো দেশের আধিপত্য বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ভিত্তিতে নয়।

যে দাবিগুলো তুলেছেন নাহিদ

ফেসবুক পোস্টে নাহিদ ইসলাম কয়েকটি বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে ভারতের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও দুঃখ প্রকাশ আদায়;
  • শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি সমাধান করা;
  • ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নেওয়া;
  • ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধের নিশ্চয়তা;
  • ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের আশ্রয় ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ভারতের সুস্পষ্ট অবস্থান নিশ্চিত করা;
  • সাম্প্রতিক ঘটনাবলির জন্য কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যদি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ পায়, তাহলে একই সময়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সফর করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ অর্থবহ হবে না।

‘বন্ধুত্ব সার্বভৌমত্ব উপেক্ষার অজুহাত হতে পারে না’

পোস্টের শেষাংশে নাহিদ ইসলাম বলেন, বন্ধুত্বের অজুহাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা যাবে না।

তার বক্তব্য, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ, আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের আশ্রয় ও কার্যক্রম নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করা এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সম্পর্ক গড়ে উঠতে হলে তা আধিপত্য বা রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অনধিকারচর্চা না করা এবং দুই দেশের জনগণের অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনটিতে উল্লিখিত অভিযোগ ও দাবিগুলো নাহিদ ইসলামের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে দেওয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন