রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬

জ্বালানি তেল বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ স্থগিতের দাবি জামায়াতের

‘সংস্কার নয়, হস্তান্তর’—জ্বালানি নীতিমালা নিয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ৬ দফা দাবি

ঢাকা, ৮ আগস্ট ২০২৬:
পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিতের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, প্রস্তাবিত উদ্যোগ সংস্কারের পরিবর্তে জ্বালানি খাতে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ’ নিয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন।

‘ঢালাও বেসরকারিকরণের বিরোধিতা করছি না’

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতে ইসলামী ঢালাওভাবে বেসরকারিকরণের বিরোধিতা করে না। তবে কোনো খাত বেসরকারি হাতে দেওয়ার ফলে দুর্নীতি, লুটপাট, ভাগাভাগি বা সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হলে তার প্রতিবাদ করা প্রয়োজন।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের দায়িত্ব বেসরকারি খাতে দেওয়া হলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়তে পারে।

‘এটি সংস্কার নয়, হস্তান্তর’

জ্বালানি খাতের সাম্প্রতিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান পরিবর্তনের পর বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দলটির ভাষ্য, নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “এটি সংস্কার নয়, এটি হস্তান্তর। এটি প্রতিযোগিতা নয়”— এমন দাবি করে তিনি উদ্যোগটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর হাতে বাজার কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা

জামায়াতের দাবি, জ্বালানি তেলের ব্যবসা বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত করা হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার পরিবর্তে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর হাতে বাজার কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

দলটির যুক্তি, জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর সুবিধা, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় আকারের ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন এবং বিপুল পরিমাণ ব্যাংক অর্থায়ন প্রয়োজন।

এসব অবকাঠামো ও আর্থিক সক্ষমতা দেশে সীমিতসংখ্যক শিল্পগোষ্ঠীর রয়েছে বলে দাবি করে দলটি বলেছে, রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থা ভেঙে বেসরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থা তৈরি হলে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে বাজারে নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

জামায়াত আরও বলেছে, জ্বালানি খাতে বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি হলে সংসদীয় জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিপিসিকে ‘লোকসানি’ দেখানোর যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন

বিপিসিকে অদক্ষ বা লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করে বেসরকারিকরণের পক্ষে যুক্তি দেওয়ারও বিরোধিতা করেছে জামায়াত।

দলটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

তাদের দাবি, তাই প্রতিষ্ঠানটির সংস্কার প্রয়োজন হলে সেটি বেসরকারিকরণের মাধ্যমে না করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে করা উচিত।

৬ দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি খাত নিয়ে সরকারকে ছয়টি দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দাবিগুলো হলো—

১. পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সব উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিত করা।

২. প্রস্তাবিত খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি জনসম্মুখে প্রকাশ এবং জনগণের মতামত দেওয়ার জন্য অন্তত ৬০ দিনের সময় দেওয়া।

৩. সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানির আয়োজন করা। সেখানে বিরোধী দল, ভোক্তা অধিকার সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক ফেডারেশন ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া।

৪. বেসরকারিকরণের পরিবর্তে বিপিসির সংস্কার করা। এর মধ্যে স্বাধীন নিরীক্ষা, বোর্ডে পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়োগ, ক্রয় প্রক্রিয়ায় ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা এবং প্রতি তিন মাসে জ্বালানি তেলের আমদানি মূল্য ও পরিমাণ প্রকাশের দাবি জানানো হয়।

৫. ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) নির্মাণ এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন করা।

৬. জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের আইনি সুরক্ষা খর্ব করার সব সুপারিশ প্রত্যাহার করা।

‘জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে’

জামায়াতের নেতারা বলেন, জ্বালানি তেল দেশের অর্থনীতি, পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এ খাতে যেকোনো নীতিগত পরিবর্তনের আগে এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তাঁদের মতে, জ্বালানি খাতে সংস্কার প্রয়োজন হলে তা হতে হবে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা, জবাবদিহি ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করার ভিত্তিতে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান, সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিমসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন