রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬

‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে মর্যাদাপূর্ণ’

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে নাহিদ ইসলাম

ঢাকা, ৮ আগস্ট ২০২৬:
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে ভালো বা খারাপ—এই দুইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মর্যাদা, পারস্পরিক স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে পরিচালনা করা উচিত। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে যে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার সঙ্গে ভারতের সংশ্লিষ্টতা ছিল।

শনিবার রাজধানীর জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভয় বা চাপের পরিবর্তে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাঁর ভাষায়, দুই দেশের সম্পর্ক ভালো কিংবা খারাপ—এভাবে দেখার বিষয় নয়; সম্পর্ক হতে হবে মর্যাদাপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, বিএনপি হয়তো ভারতকে ভয় পাচ্ছে এবং সরকার মনে করছে, বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ভালো রাখা সম্ভব হবে। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

‘জাদুঘর যেন কোনো দলের ইতিহাসের জায়গা না হয়’

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর মতে, এই প্রতিষ্ঠান কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর ইতিহাস তুলে ধরার জায়গা না হয়ে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়া উচিত।

নাহিদ ইসলাম বলেন, গণভবন থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। তাঁর অভিযোগ, এই স্থান থেকেই মানুষের ওপর দমন-পীড়ন, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক লুটপাটের মতো কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। সে কারণেই অন্তর্বর্তী সরকার গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছিল।

তিনি জানান, জাদুঘরটি দ্রুত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা এবং এর কার্যক্রম নিয়ে তিনি সংসদে ও সংসদের বাইরে বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছেন। এর আগে নিজেও জাদুঘরটি পরিদর্শন করেছিলেন বলে জানান তিনি।

‘সীমান্ত হত্যার স্মৃতি সরানো হয়েছে’

জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যথাযথভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, সীমান্তে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো নিয়ে একটি অংশ আগে ছিল। সীমান্ত হত্যার স্মৃতি এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন স্মারকও প্রদর্শনীর অংশ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, পরবর্তীতে এসব উপাদান সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস উপস্থাপনে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরার আহ্বান

জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস আরও বিস্তৃত ও ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপনের দাবি জানিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তি বা নেতৃস্থানীয় মুখকে সামনে রাখলে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রকৃত ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে উঠে আসবে না। আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন জেলা, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ মানুষের যে ভূমিকা ছিল, সেগুলোও নথিভুক্ত করা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ টাইমলাইন তৈরি করে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়, অঞ্চলভিত্তিক ঘটনা, আন্দোলনকারীদের ভূমিকা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে ধারাবাহিকভাবে প্রদর্শন করা উচিত।

জাদুঘর পরিচালনায় স্বায়ত্তশাসনের দাবি

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিচালনার কাঠামো নিয়েও কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, জাদুঘরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জনবল প্রয়োজন। বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

নাহিদ ইসলাম জানান, সংসদে তাঁরা জাদুঘরটিকে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করেন এবং ইতিহাস সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—এমন ব্যক্তিদের নিয়ে এর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। জাদুঘরের সংগ্রহ, প্রদর্শনী ও গবেষণায় আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অবদান সমানভাবে তুলে ধরতে হবে।

ইতিহাস সংরক্ষণে নিরপেক্ষতার তাগিদ

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরকে কেন্দ্র করে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্ব পায়—জাতীয় ইতিহাসের নিরপেক্ষ সংরক্ষণ, জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সব পক্ষের অবদান যথাযথভাবে তুলে ধরা এবং জাদুঘর পরিচালনায় প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস কোনো একক ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরতে হলে সব ঘটনার তথ্য, দলিল, স্মৃতি ও অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা সংরক্ষণ করতে হবে।

জাদুঘর পরিদর্শনের সময় এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন