অনুসরণ করুন:
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

পেপল-পেওনিয়ারের পথ খুলছে, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল লেনদেনে নতুন কাঠামো আনল বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন আরও সহজ ও আধুনিক করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই উদ্যোগের ফলে ভবিষ্যতে পেপল, পেওনিয়ারসহ আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর ও ডিজিটাল পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে দেশের ব্যাংকগুলো বৈধভাবে আন্তসীমান্ত (ক্রসবর্ডার) ডিজিটাল লেনদেনের সেবা চালু করতে পারবে।

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। নতুন নির্দেশনায় ‘ব্যাংক-মধ্যস্থতাকারী কাঠামো’ (Bank-mediated Framework) চালুর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও নিরাপদ করার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সেবাভিত্তিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি, ফ্রিল্যান্সিং ও ই-কমার্স খাতকে শক্তিশালী করা এবং বৈদেশিক লেনদেনের অবকাঠামো আধুনিকায়নের লক্ষ্যেই এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।

ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হবে ডিজিটাল ওয়ালেট

নতুন ব্যবস্থায় দেশের ব্যাংকগুলো বিদেশি ডিজিটাল পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে এবং অন্যান্য অনুমোদিত আন্তর্জাতিক লেনদেন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করে গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট (ডিভিএ) বা ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর সুযোগ পাবে।

তবে এসব ওয়ালেট স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হবে না। প্রতিটি গ্রাহকের ডিজিটাল ওয়ালেট সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের একটি ‘মাস্টার ডিভিএ’ বা সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে সব ধরনের লেনদেন ব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনায় বলেছে, প্রতিটি লেনদেনের রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং আলাদা হিসাব সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। গ্রাহকের অব্যবহৃত অর্থও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং প্রয়োজনে তা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সমন্বয় বা ফেরত দিতে হবে।

কী কী কাজে ব্যবহার করা যাবে

নতুন কাঠামোর আওতায় ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বৈদেশিক মুদ্রায় ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ব্যক্তিগত ভ্রমণ, চিকিৎসা, শিক্ষা বা সরকারি অনুমোদিত ভ্রমণ কোটার আওতায় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ছোটখাটো অনলাইন লেনদেনেও এই সুবিধা ব্যবহার করা যাবে।

প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ৩০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অনলাইন কেনাকাটা বা অর্থ পরিশোধ করা যাবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সদস্যপদ ফি, সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট সেবা, ভিসা প্রসেসিং ফি এবং অনলাইনে হোটেল বুকিংয়ের অর্থ পরিশোধেও এই ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করা যাবে।

ফ্রিল্যান্সার ও রপ্তানিকারকদের জন্য বড় সুবিধা

নতুন নীতিমালায় দেশের ফ্রিল্যান্সার, সফটওয়্যার পেশাজীবী, আইটি সেবাদাতা এবং ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য সুবিধা রাখা হয়েছে।

তারা বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্জিত অর্থ সহজে দেশে আনতে পারবেন এবং বৈদেশিক লেনদেন আরও দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন।

এছাড়া এক্সপোর্ট রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ) এবং রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (আরএফসিডি) হিসাবধারীরাও এই সুবিধার আওতায় আসবেন। ইআরকিউ হিসাব পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ তিনজন শীর্ষ কর্মকর্তা ব্যবসায়িক প্রয়োজনের জন্য ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারবেন।

বিদেশি পর্যটকরাও পাবেন সুবিধা

বাংলাদেশ সফরে আসা বিদেশি নাগরিক ও পর্যটকদের জন্যও নতুন এই ব্যবস্থায় সুবিধা রাখা হয়েছে। তারা অনুমোদিত ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা মার্চেন্ট পয়েন্টে সহজেই ডিজিটাল পেমেন্ট করতে পারবেন, যা পর্যটন খাতে নগদ অর্থ বহনের প্রয়োজনীয়তা কমাতে সহায়ক হবে।

অনুমোদন ছাড়া সেবা চালু করা যাবে না

বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, কোনো ব্যাংক এই সেবা চালুর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।

এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং পরিচালন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে।

এছাড়া অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন, গ্রাহক পরিচিতি (কেওয়াইসি) এবং লেনদেন পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত সব নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। নিয়মিত লেনদেনের তথ্যও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রতিবেদন আকারে জমা দিতে হবে।

ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই কাঠামো কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও বাড়বে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স এবং সেবাভিত্তিক রপ্তানি খাত উপকৃত হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক অর্থ দেশে আনতে সহজ, নিরাপদ ও আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় পেপল বা পেওনিয়ারের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর অংশীদারিত্বের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ভবিষ্যতে এ ধরনের বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সেবা বাংলাদেশে চালুর পথ আরও সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন