শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬

প্রবাসী কার্ডে মিলবে বিমানবন্দর থেকে চিকিৎসা-ঋণ পর্যন্ত ১০ বিশেষ সুবিধা

দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ সুবিধাসংবলিত ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করছে সরকার। এই কার্ডের মাধ্যমে বিমানবন্দরে বিশেষ লাউঞ্জ ও দ্রুত ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে বিমান টিকিট ও হোটেলে ছাড়, চিকিৎসা, বীমা, পুনর্বাসন, সরকারি সেবায় অগ্রাধিকার, রেমিট্যান্স রিওয়ার্ড এবং ঋণ সুবিধাসহ অন্তত ১০ ধরনের বিশেষ সেবা পাওয়ার কথা রয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশে-বিদেশে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনাই প্রবাসী কার্ডের মূল লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চামেলী হলে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে কার্ডটির বিভিন্ন সুবিধা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।

বিমানবন্দরে লাউঞ্জ ও দ্রুত ইমিগ্রেশন

প্রবাসী কার্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা থাকবে বিমানবন্দরে।

কার্ডধারীরা দেশে ও বিদেশে কমপ্লিমেন্টারি এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি বিশেষ ইমিগ্রেশন বুথের মাধ্যমে তাদের দ্রুত সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এর উদ্দেশ্য দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা ও বিমানবন্দরকেন্দ্রিক হয়রানি কমিয়ে প্রবাসীদের যাতায়াত আরও সহজ করা।

মিলবে ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ সেবা

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী কার্ডধারীদের জন্য কমপ্লিমেন্টারি ‘Meet & Greet’ সেবাও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই ব্যবস্থায় বিমানবন্দরে আগমন ও প্রস্থানের সময় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট সেবা গ্রহণে সহায়তা পাবেন কার্ডধারীরা।

বিমান টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ে বিশেষ ছাড়

প্রবাসী কার্ড ব্যবহার করে বিমান টিকিট ও হোটেল বুকিংয়েও বিশেষ ছাড় পাওয়ার কথা রয়েছে।

ইতোমধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকিট এবং বলাকা লাউঞ্জ ব্যবহারে প্রবাসী কার্ডধারীদের বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ ছাড়া বিমানবন্দরে প্রায়োরিটি চেক-ইন ও বোর্ডিং সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

বিমানবন্দরে Pick & Drop সুবিধা

কার্ডধারীদের দেশে ও বিদেশে ন্যায্যমূল্যে গাড়ি বুকিংয়ের সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষ করে ‘সিগনেচার কার্ড’ধারীরা বিমানবন্দরে Pick & Drop সেবা পাবেন। ফলে দেশে আসা কিংবা বিদেশে যাওয়ার সময় বিমানবন্দর থেকে যাতায়াতের জন্য আগে থেকেই পরিবহনের ব্যবস্থা করার সুযোগ তৈরি হবে।

সরকারি হাসপাতালে আলাদা সেবা বুথ

প্রবাসী ও তাদের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টিও কার্ডের সুবিধার মধ্যে রাখা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সেবা বুথ থাকবে। একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রবাসী কার্ডধারীদের বিশেষ ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এর মাধ্যমে দেশে ফিরে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রবাসীরা দ্রুত ও তুলনামূলক সুবিধাজনক সেবা পাবেন বলে সরকারের প্রত্যাশা।

মৃত্যু হলে বিনা খরচে মরদেহ দেশে আনা

বিদেশে কোনো প্রবাসী কার্ডধারীর মৃত্যু হলে তার মরদেহ বিনা খরচে দেশে পরিবহনের সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রবাসী পরিবারের জন্য বিদেশ থেকে মরদেহ দেশে আনা অনেক সময় ব্যয়বহুল ও জটিল প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়। প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে এই ব্যয় ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।

দেশে ফিরলে পুনর্বাসন ও বীমা

বিদেশ থেকে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও প্রবাসী কার্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।

প্রবাসফেরতদের পুনর্বাসন কর্মসূচির পাশাপাশি বীমা সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে কর্মজীবন শেষে দেশে ফেরা প্রবাসীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণে সহায়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

জমি রেজিস্ট্রেশন-নামজারিতেও অগ্রাধিকার

প্রবাসীরা দেশে সম্পত্তি ও বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রায়ই দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ করেন। প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে এ ধরনের কয়েকটি সেবায় অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

এর মধ্যে রয়েছে জমি রেজিস্ট্রেশন ও নামজারি, ইউটিলিটি সংযোগ, বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স এবং বৈদেশিক বিনিয়োগসংক্রান্ত সেবা।

রেমিট্যান্স পাঠালে রিওয়ার্ড পয়েন্ট

প্রবাসী কার্ডের আর্থিক সুবিধার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোকে উৎসাহিত করা।

কার্ডের সঙ্গে ‘Remittance Reward Point’ ব্যবস্থা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ভিত্তিতে প্রবাসীরা রিওয়ার্ড সুবিধা পেতে পারেন।

একই সঙ্গে প্রবাসীদের জন্য ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে ঋণ সুবিধাও যুক্ত হবে।

কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ পাঠানো এবং সহজে আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থাও থাকবে।

এনআইডি-পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবায় অগ্রাধিকার

জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট, কনস্যুলার ও ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রেও প্রবাসী কার্ডধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের অন্যান্য প্রাসঙ্গিক সেবার সঙ্গেও পর্যায়ক্রমে প্রবাসী কার্ডকে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

ডুয়াল-কারেন্সি কার্ড

প্রবাসী কার্ডকে শুধু পরিচয় বা সেবা গ্রহণের কার্ড হিসেবে নয়, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যম হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে সরকার।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ডুয়াল-কারেন্সি ডেবিট কার্ড হিসেবে চালুর উদ্যোগ রয়েছে। ব্যাংক পেমেন্ট গেটওয়ের সঙ্গে কার্ডটি সংযুক্ত থাকবে, যাতে প্রবাসীরা সহজ, দ্রুত ও নিরাপদভাবে রেমিট্যান্স ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন করতে পারেন।

কার্ডে একজন প্রবাসী কর্মীর ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি তার দক্ষতা ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই পর্যায়ক্রমে বিতরণ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটেও প্রবাসী কার্ড চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তব্যে জানান, প্রবাসী কর্মীদের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার এ কার্ড চালু করছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে পর্যায়ক্রমে প্রবাসীদের মধ্যে কার্ড বিতরণ করা হবে।

প্রাথমিক পরিকল্পনায় পরীক্ষামূলক পর্যায়ে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ডুয়াল-কারেন্সি ডেবিট কার্ড চালুর কথা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ হাজার এবং আগামী বছরের জুনের মধ্যে দুই লাখ কার্ড ইস্যু করা।

প্রবাসীদের জন্য সমন্বিত সেবা ব্যবস্থার লক্ষ্য

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন।

সরকারের লক্ষ্য, তাদের শুধু রেমিট্যান্স প্রেরণকারী হিসেবে না দেখে নাগরিক সেবা, আর্থিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, যাতায়াত এবং দেশে ফেরার পর পুনর্বাসন—সবগুলো বিষয়কে একটি সমন্বিত কাঠামোয় আনা।

পরিকল্পিত সব সুবিধা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রবাসী কার্ড একজন প্রবাসীর বিমানবন্দর যাত্রা থেকে শুরু করে ব্যাংকিং, চিকিৎসা, সরকারি সেবা এবং দেশে ফিরে পুনর্বাসন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত সেবা ব্যবস্থায় প্রবেশের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন