ফিঙ্গারপ্রিন্টে শনাক্ত নিহতের পরিচয়; খুলনা থেকে এক সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার, মোবাইল ফোন ও ছুরি উদ্ধার; আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি
ঢাকা, ১৯ আগস্ট ২০২৬:
ঢাকার আশুলিয়ায় তালাবদ্ধ একটি কক্ষ থেকে গলাকাটা ও পচনধরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত এবং হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা জেলা। এ ঘটনায় মো. আল-আমিন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তির হেফাজত থেকে নিহতের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলের বাথরুমের প্যানের ভেতর থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে দাবি করা একটি ছুরিও উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তার আল-আমিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থাটি।
তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে ছড়াচ্ছিল দুর্গন্ধ
পিবিআই ঢাকা জেলার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৬ আগস্ট আশুলিয়া থানার বাসাইদ এলাকায় রাজু সিটির সামনে আমির আলীর ভাড়া দেওয়া একটি তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। বিষয়টি টের পেয়ে বাড়ির মালিক তাহেরুন্নেসা পুলিশকে খবর দেন।
পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কক্ষের তালা ভেঙে এক ব্যক্তির পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করে। তখন ওই ব্যক্তির পরিচয় জানা যায়নি।
খবর পেয়ে পিবিআই ঢাকা জেলার ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থলে যায়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তির নাম মো. কামরুল খান (৪৪)। তিনি খুলনার তেরখাদা উপজেলার নয়াবরসাত এলাকার বাসিন্দা।
হত্যা মামলা, তদন্তভার নেয় পিবিআই
এ ঘটনায় নিহত কামরুলের মামাতো ভাই মো. জামিল শেখ বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে আশুলিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন।
১৭ আগস্ট দায়ের করা মামলাটির নম্বর ১০০। দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি করা হয়।
একই দিন পিবিআই ঢাকা জেলা স্বউদ্যোগে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান পুলিশ পরিদর্শক (নিঃ) মো. জামাল উদ্দীন, বিপিএম।
খুলনার তেরখাদা থেকে গ্রেপ্তার
তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে সন্দেহভাজন ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করা হয় বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পরে পিবিআই খুলনার সহযোগিতায় ১৭ আগস্ট খুলনার তেরখাদা থানা এলাকা থেকে মো. আল-আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে নিহত কামরুলের মোবাইল ফোন উদ্ধারের দাবি করেছে তদন্ত সংস্থাটি।
এরপর আল-আমিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আশুলিয়ার ঘটনাস্থলে অভিযান চালানো হয়। সেখানে কক্ষের বাথরুমের প্যানের ভেতর থেকে একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়। পিবিআইয়ের দাবি, ওই ছুরিই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছিল।
কাজের সন্ধানে একসঙ্গে আশুলিয়ায় এসেছিলেন
পিবিআইয়ের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত কামরুল ও গ্রেপ্তার আল-আমিন দুজনই খুলনার তেরখাদা এলাকার বাসিন্দা। ছোটবেলা থেকেই তারা একে অপরের পরিচিত ছিলেন।
কাজের সন্ধানে গত ৮ আগস্ট তারা খুলনা থেকে আশুলিয়ায় আসেন। সেখানে একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে রাজমিস্ত্রির কাজে যোগ দেন।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট রাতে অর্থ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। কাজের টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আল-আমিন কামরুলের কাছে টাকা চাইলে তাদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়।
তদন্ত সংস্থাটির দাবি, একপর্যায়ে একটি সবজি কাটার ছুরি নিয়ে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এ সময় আল-আমিন ছুরিটি নিয়ে কামরুলের গলায় আঘাত করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই কামরুলের মৃত্যু হয় বলে পিবিআই জানিয়েছে।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, ঘটনার পর ছুরিটি বাথরুমের প্যানে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর কক্ষে তালা দিয়ে আল-আমিন খুলনায় চলে যান।
ভাড়াটিয়ার পরিচয়পত্র না রাখায় শুরুতে তৈরি হয় জটিলতা
তদন্তে আরও জানা গেছে, কক্ষ ভাড়া দেওয়ার সময় বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়াদের কোনো পরিচয়পত্র বা মোবাইল নম্বর সংরক্ষণ করেননি। ফলে মরদেহ উদ্ধারের পর প্রাথমিক পর্যায়ে নিহত ব্যক্তি কিংবা তার সঙ্গে ওই কক্ষে থাকা অন্য ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরে ফিঙ্গারপ্রিন্ট, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে নিহত ব্যক্তির পরিচয় এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।
গ্রেপ্তার আল-আমিনকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ঘটনার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পিবিআইয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই ঢাকা জেলা।

