সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

বিশ্ববাজারে পাম অয়েলের ঊর্ধ্বমুখী দামের আভাস

বিশ্ববাজারে পাম অয়েলের দামে ফের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার B50 বায়োডিজেল কর্মসূচি, ভারতের বাড়তি আমদানি, শক্তিশালী জ্বালানি তেলের বাজার এবং আগামী বছরগুলোতে El Niño-এর সম্ভাব্য প্রভাব—সব মিলিয়ে পাম অয়েলের আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

মালয়েশিয়ার বেঞ্চমার্ক পাম অয়েল ফিউচারস সোমবার, ১৭ আগস্ট, প্রতি টনে প্রায় ৪,৭২৫ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (RM)-এর কাছাকাছি লেনদেন হয়েছে। চলতি মাসে বাজার প্রায় ৩ শতাংশ এবং গত এক বছরের তুলনায় প্রায় ৪.৩ শতাংশ ওপরে রয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে মালয়েশিয়ার বাড়তে থাকা মজুত পাম অয়েলের দামে কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে। তবে ইন্দোনেশিয়ার B50 কর্মসূচির কারণে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ভারতের মতো বড় আমদানিকারক দেশের বাড়তি চাহিদা বাজারকে শক্তিশালী রাখছে।

ইন্দোনেশিয়ার B50 কর্মসূচি

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পাম অয়েল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক ইন্দোনেশিয়া চলতি বছরের জুলাই থেকে B50 বায়োডিজেল কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এর আওতায় ডিজেলের সঙ্গে ৫০ শতাংশ পাম অয়েলভিত্তিক বায়োডিজেল মেশানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের কাছে এই কর্মসূচি পাম অয়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ, উৎপাদনের একটি বড় অংশ বায়োডিজেল খাতে চলে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির জন্য উপলব্ধ CPO-এর পরিমাণ কমতে পারে। ফলে অন্যান্য প্রধান উৎপাদক দেশে উৎপাদন প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে বৈশ্বিক সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার B50 কর্মসূচি ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার পাম অয়েল ফিউচারস বাজারে প্রভাব ফেলছে। জুলাইয়ের শুরুতেই B50 কর্মসূচি চালুর খবরের পর CPO ফিউচারসের দাম বেড়েছিল।

ভারতের বাড়তি আমদানি

বিশ্ববাজারে পাম অয়েলের চাহিদা বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ ভারত। ভারতের Solvent Extractors’ Association-এর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে দেশটির পাম অয়েল আমদানি জুনের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ৭৩০,৯৬৫ টনে পৌঁছেছে। এটি পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

একই সময়ে ভারতের মোট ভোজ্যতেল আমদানি ৩৩.৩ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৪.৮ লাখ টনে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ। আগস্ট-নভেম্বরের উৎসব মৌসুমকে সামনে রেখে রিফাইনারদের আগাম মজুত বৃদ্ধিই আমদানি বাড়ার অন্যতম কারণ।

বাজারসংশ্লিষ্টদের ধারণা, আগস্টেও ভারতের পাম অয়েল আমদানি ৭ লাখ টনের ওপরে থাকতে পারে। ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোজ্যতেল বাজার ভারতের চাহিদা পাম অয়েলের আন্তর্জাতিক দামে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

মালয়েশিয়ায় উৎপাদন ও মজুত বেড়েছে

অন্যদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাম অয়েল উৎপাদক মালয়েশিয়ায় সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে। জুলাইয়ে দেশটির পাম অয়েল উৎপাদন বেড়ে প্রায় ১.৭৯ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে। একই সময়ে মাস শেষে মজুত বেড়ে প্রায় ২.৬৩ মিলিয়ন টনে দাঁড়িয়েছে, যা পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়।

উৎপাদন রপ্তানির তুলনায় দ্রুত বাড়ায় মজুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে মালয়েশিয়ার বাড়তি সরবরাহ আন্তর্জাতিক দামের বড় ধরনের উল্লম্ফন ঠেকাতে পারে। তবে একই সময়ে জুলাইয়ে রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা বাজারে চাহিদার শক্ত অবস্থান নির্দেশ করছে।

আগস্টে দামের সম্ভাব্য পরিসর

Malaysia Palm Oil Council (MPOC) আগস্ট মাসে মালয়েশিয়ান CPO-এর দাম প্রতি টনে RM4,400 থেকে RM4,650-এর মধ্যে থাকার পূর্বাভাস দিয়েছিল। তবে সর্বশেষ বাজারদর এই পূর্বাভাসের ওপরের দিক অতিক্রম করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী রপ্তানি চাহিদা, ইন্দোনেশিয়ার B50 কর্মসূচি এবং অন্যান্য ভোজ্যতেলের দামের পরিবর্তন CPO-কে এই রেঞ্জের ওপরেও নিয়ে যেতে পারে।

El Niño নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

পাম অয়েলের বাজারে সবচেয়ে বড় মধ্যমেয়াদি ঝুঁকির একটি হয়ে উঠেছে El Niño। শুষ্ক ও উষ্ণ আবহাওয়ার প্রভাব পাম গাছে তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায় না; উৎপাদনে এর প্রভাব পড়তে সাধারণত ১২ থেকে ১৬ মাস সময় লাগতে পারে।

মালয়েশিয়ার বড় পাম অয়েল উৎপাদক SD Guthrie-এর সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, El Niño-এর প্রভাব ২০২৭ ও ২০২৮ সালের উৎপাদনে দেখা দিতে পারে। ২০২৬ সালের উৎপাদন তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও পরবর্তী বছরগুলোতে সরবরাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বাজারে এরই মধ্যে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। SD Guthrie-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, CPO-এর দাম ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে RM5,200 প্রতি টন পর্যন্ত উঠতে পারে—যদিও এটি একটি সম্ভাব্য বাজারচিত্র, নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।

পাম অয়েলের সামনে দুই ধরনের চাপ

বর্তমান বাজারে একদিকে উৎপাদন ও মজুত বৃদ্ধির কারণে দাম কমার চাপ রয়েছে, অন্যদিকে B50, ভারতীয় চাহিদা ও আবহাওয়া ঝুঁকির কারণে দাম বাড়ার শক্তিও রয়েছে।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—

দাম বাড়াতে পারে:

  • ইন্দোনেশিয়ার B50 বায়োডিজেল কর্মসূচি
  • ভারতের বাড়তি আমদানি
  • শক্তিশালী ক্রুড অয়েল বাজার
  • সম্ভাব্য El Niño
  • ভবিষ্যৎ সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা

দামে চাপ তৈরি করতে পারে:

  • মালয়েশিয়ায় উৎপাদন বৃদ্ধি
  • বাড়তে থাকা পাম অয়েল মজুত
  • soybean ও sunflower oil-এর সরবরাহ
  • বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে ভোজ্যতেলের চাহিদা কমার সম্ভাবনা

বাংলাদেশের বাজারেও পড়তে পারে প্রভাব

বিশ্ববাজারে পাম অয়েলের দাম বাড়লে এর প্রভাব বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়েও পড়তে পারে। বাংলাদেশ পাম অয়েলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমদানিকারক হওয়ায় আন্তর্জাতিক CPO মূল্য, ডলারের বিনিময় হার, জাহাজভাড়া, বীমা ও আমদানি-সংক্রান্ত ব্যয়—সব মিলিয়ে স্থানীয় বাজারে ভোজ্যতেলের দামে চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে CPO-এর দাম যদি একই সময়ে বাড়ে এবং টাকার বিপরীতে ডলারের দামও ঊর্ধ্বমুখী থাকে, তাহলে বাংলাদেশের আমদানিকারকদের প্রকৃত ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

সামনে কী দেখছে বাজার

বর্তমান পরিস্থিতিতে পাম অয়েলের বাজারকে স্বল্পমেয়াদে শক্তিশালী কিন্তু ওঠানামাপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। মালয়েশিয়ার বাড়তি মজুত বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি কিছুটা সীমিত করতে পারে। তবে ইন্দোনেশিয়ার B50 কর্মসূচি এবং ভারতের শক্তিশালী আমদানি অব্যাহত থাকলে চাহিদার চাপ সরবরাহ বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আর ২০২৭-২৮ সালে El Niño-এর সম্ভাব্য প্রভাব বাস্তবে উৎপাদন কমিয়ে দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে পাম অয়েলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার ঝুঁকি কম নয়। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার B50 কর্মসূচির বাস্তবায়ন, মালয়েশিয়ার মজুত, ভারত ও চীনের আমদানি, soybean oil-এর দাম এবং El Niño—এই পাঁচটি বিষয় আগামী মাসগুলোতে বিশ্ব পাম অয়েলের দামের গতিপথ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন