অনুসরণ করুন:
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

ইরান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনে মানসিক চাপে ‘আব্রাহাম লিংকন’-এর নাবিকেরা, আত্মহানির আশঙ্কা

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে দীর্ঘদিন সমুদ্রে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিনের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, টানা দায়িত্ব পালন, সীমিত বন্দরে যাত্রাবিরতি এবং রণতরিতে রসদ ও অন্যান্য সুবিধা নিয়ে অভিযোগের মধ্যে কয়েকজন নাবিকের আত্মহানির চেষ্টা বা আত্মহানির চিন্তার কথাও সামনে এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে সরাসরি তুলে ধরেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংবাদমাধ্যম Stars and StripesNavy Times-এর প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও বিষয়টি সামনে এনেছে। 

‘আগামীকাল যেন আর ঘুম থেকে না উঠি’

সান ডিয়েগোতে নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক টাউন হল বৈঠকে প্রায় ২০০ জন অংশ নেন। সেখানে এক নাবিকের স্ত্রী জানান, বৈঠকের দিনই তাঁর স্বামীর কাছ থেকে একটি উদ্বেগজনক বার্তা পেয়েছিলেন। তিনি কর্মকর্তাদের জানান, তাঁর স্বামী লিখেছেন—তিনি আশা করছেন, পরদিন যেন আর ঘুম থেকে না ওঠেন

পরিবারের সদস্যরা নৌবাহিনীর নেতৃত্বের কাছে দীর্ঘ মোতায়েনের কারণে নাবিকদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থার অবনতির বিষয়টি তুলে ধরেন। বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা রণতরিতে কাউন্সেলর, চ্যাপলিন, চিকিৎসক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকার কথা জানান এবং আরও সহায়তা পাঠানোর উদ্যোগের কথা বলেন।

তবে নাবিকদের পরিবারগুলোর অভিযোগ, এসব ব্যবস্থা বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় যথেষ্ট নয়। 

২৫০ দিনের বেশি সমুদ্রে

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর নিয়মিত মোতায়েনের উদ্দেশ্যে সান ডিয়েগো ছাড়ে। পরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে সেটিকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে ঘুরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রণতরিটি ওই অঞ্চলে পৌঁছানোর পর থেকে ইরানকেন্দ্রিক মার্কিন সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

জুলাইয়ের শুরুতে Stars and Stripes জানিয়েছিল, লিংকন টানা ২০৭ দিন সমুদ্রে থেকে আগের রেকর্ড ভেঙেছিল। পরবর্তী সময়ে সেটি ২৫০ দিনেরও বেশি সময় সমুদ্রে কাটিয়েছে। 

এত দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান মার্কিন নৌবাহিনীর জন্যও অস্বাভাবিক। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের সময় নাবিকদের বিশ্রাম, রসদ সংগ্রহ, জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিতে নিয়মিত বন্দরে যাত্রাবিরতি রাখা হয়।

‘জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা’

নাবিকদের পরিবার ও সহকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

Stars and Stripes–এর প্রতিবেদনে পরিবার ও নাবিকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এমন ঘটনার কথা উঠে এসেছে। তবে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঘটনার বিষয়ে মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি নিশ্চিত বা বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। 

নৌবাহিনী অবশ্য বলেছে, আব্রাহাম লিংকনের ক্রুদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে নেতৃত্ব নিয়মিত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

খাবার, পানি ও ডাক যোগাযোগ নিয়েও অভিযোগ

মানসিক চাপের পাশাপাশি রণতরিতে জীবনযাপন নিয়েও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।

তাঁদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে খাবার ও পানির ঘাটতি, প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রীর সংকট, জাহাজের কিছু অবকাঠামোগত সমস্যা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং পরিবারের সঙ্গে ডাক যোগাযোগে বিঘ্ন।

তবে পরিবারগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে এসব সমস্যার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। জুলাইয়ের শুরুতে ওমানের একটি বন্দরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির সময় রণতরিতে নতুন করে রসদ সরবরাহ করা হয়। এরপর নাবিকেরা দীর্ঘ সময় পর তাজা খাবার পাওয়ার সুযোগ পান বলে কয়েকজন জানান।

অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর দাবি, রণতরিতে খাবার, নিরাপদ পানি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু রয়েছে। 

পরিবারগুলোর ক্ষোভ—ফেরার তারিখ কেন নেই?

নাবিকদের পরিবারের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, আব্রাহাম লিংকন কবে দেশে ফিরবে সে বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি জানানো।

দীর্ঘদিন সমুদ্রে থাকার পরও রণতরিটির মোতায়েনের শেষ তারিখ স্পষ্ট না হওয়ায় নাবিকদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়ছে বলে পরিবারের সদস্যরা মনে করছেন।

সান ডিয়েগোর বৈঠকে এক নাবিকের স্ত্রী নৌবাহিনীর নেতৃত্বকে বলেন, তাঁদের সঙ্গে সামরিক নেতৃত্বের আস্থার সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অন্য এক নাবিকের ভাষ্য, এখন তাঁরা নতুন কোনো বন্দরবিরতি বা অতিরিক্ত সুবিধা চান না; তাঁরা শুধু দেশে ফেরার একটি নির্দিষ্ট তারিখ জানতে চান।

নতুন রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েনে থাকা আব্রাহাম লিংকনকে প্রতিস্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠাচ্ছে। এর ফলে লিংকনের ক্রুদের দেশে ফেরার পথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। 

তবে কবে নাগাদ আব্রাহাম লিংকন পুরোপুরি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়ে সান ডিয়েগোতে ফিরবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রণতরিটির দীর্ঘ মোতায়েন নিয়ে ওঠা সমালোচনা খারিজ করে বলেছেন, সেটি ‘not nearly long enough’—অর্থাৎ তাঁর মতে মোতায়েনের সময় এখনো যথেষ্ট দীর্ঘ হয়নি। একই সময়ে তিনি জানান, রণতরিটিকে অন্য একটি জাহাজ দিয়ে প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। 


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন