অনুসরণ করুন:
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

খালেদা জিয়া: বাংলাদেশের রাজনীতির এক অনন্য অধ্যায়

ঢাকা | ১৫ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি সুপরিচিত ও প্রভাবশালী নাম। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই নেত্রী গণতান্ত্রিক আন্দোলন, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং বিরোধী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন।

আজ তাঁর জন্মদিন। এ উপলক্ষে দেশজুড়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। দলীয় কার্যালয় ও মসজিদে আয়োজন করা হয়েছে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। নেতাকর্মীরা তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও দেশের জন্য তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করছেন।

রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা ছিল অন্য অনেক রাজনীতিকের মতো নয়। তিনি সরাসরি রাজনীতিতে আসেননি; পারিবারিক জীবনের মধ্য দিয়ে তাঁর পথচলা শুরু। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেতৃত্বে পরিণত হন।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপির রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তা বাড়তে থাকে। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারির পর তিনি রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দলটির নেতৃত্ব তাঁর হাতেই ছিল।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী

১৯৮০-এর দশকে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথের আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব বিএনপিকে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে।

১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হওয়ার পর খালেদা জিয়া সরকার গঠন করেন। তাঁর প্রথম মেয়াদে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।

শিক্ষা, বিশেষ করে নারী শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের সময় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।

১৯৯৬ সালে তিনি বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন।

২০০১ সালে আবার প্রধানমন্ত্রী

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হলে খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাঁর সরকার দেশ পরিচালনা করে।

এই সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর সরকারকে ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধ ও নানা বিতর্কও ছিল।

তবে রাজনৈতিক সাফল্য ও বিরোধ—দুইয়ের মধ্য দিয়েই খালেদা জিয়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় নেত্রী হিসেবে তাঁর অবস্থান ধরে রাখেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম

২০০৭ সালে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর খালেদা জিয়াকে কারাবরণ করতে হয়। পরবর্তী সময়ে মুক্ত হয়ে তিনি আবার বিএনপির নেতৃত্বে সক্রিয় হন।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পরও তিনি বিরোধীদলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে নির্বাচন, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্যায়ে তাঁকে নানা আইনি ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একই সঙ্গে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন ছিলেন।

মানুষের কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে খালেদা জিয়া তাঁর দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ‘আপসহীন নেত্রী’ এবং দলের প্রধান রাজনৈতিক অভিভাবক।

তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি একাধিকবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, সরকার গঠন করেছে এবং দীর্ঘ সময় বিরোধী দল হিসেবেও রাজপথে সক্রিয় থেকেছে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে তীব্র মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ছিল ব্যাপক। বিশেষ করে গত কয়েক দশকের বাংলাদেশের নির্বাচন, সরকার ও বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে লেখা সম্ভব নয়।

জীবনের শেষ অধ্যায়

জীবনের শেষ কয়েক বছর শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁকে নিয়মিত চিকিৎসার মধ্যে থাকতে হয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরেও নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটে ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫। ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়। সরকার রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে। বিপুল মানুষের উপস্থিতিতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে জিয়া উদ্যানে তাঁর স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে দাফন করা হয়।

রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর উত্তরাধিকার

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুধু একটি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

একজন নারী হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি বাংলাদেশের নারীদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি যেমন রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, তেমনি বিরোধী দল হিসেবেও দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে।

তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল সাফল্য, সংগ্রাম, আন্দোলন, ক্ষমতার পালাবদল ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলার এক দীর্ঘ অধ্যায়। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতীক; আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি থাকবেন একজন দীর্ঘকালীন রাষ্ট্রনায়ক ও প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে।

স্মৃতিতে খালেদা জিয়া

আজ তাঁর জন্মদিনে দলীয় নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে স্মরণ করছেন নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে থাকলেও তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ও উত্তরাধিকার বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো দৃশ্যমান।

বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এমন এক নাম, যাঁর জীবন ও নেতৃত্ব দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির গতিপথের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর অধ্যায়টি থেকে যাবে স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন