অনুসরণ করুন:
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

রাতে লাইনে দাঁড়িয়েও দুপুরে মিলছে না গ্যাস, রাজধানীর সিএনজি পাম্পে দীর্ঘ সারি

১৫ আগস্ট ২০২৬

দেশজুড়ে গ্যাস সরবরাহে সংকটের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। কোথাও রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেও দুপুর পর্যন্ত গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করছেন চালকেরা। কোনো কোনো পাম্পে যানবাহনের সারি ছাড়িয়ে যাচ্ছে এক থেকে দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত।

গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। দীর্ঘ সময় লাইনে থাকার পরও অনেককে প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণ গ্যাস নিয়েই পাম্প ছাড়তে হচ্ছে। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং বাড়ছে যাত্রী ও পরিবহনসেবায় অনিশ্চয়তা।

বিমানবন্দর এলাকায় দেড় কিলোমিটার যানবাহনের সারি

রাজধানীর উত্তরায় বিমানবন্দরসংলগ্ন মেসার্স মাসুদ এন্টারপ্রাইজ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পের সামনে থেকে সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। সারিটি প্রায় দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

লাইনে থাকা চালকদের কেউ কেউ জানান, তাঁরা ভোর ৪টা থেকেই গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও কখন গ্যাস পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তাঁরা।

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাইভেট কারচালক লালচাঁন জানান, তিনি গ্যাস নেওয়ার জন্য ভোর ৫টায় এসে লাইনে দাঁড়ান। প্রায় ছয় ঘণ্টা অপেক্ষার পর বেলা ১১টার দিকে তাঁর গাড়িতে ১৭০ টাকার গ্যাস দেওয়া হয়।

তবে এত অল্প পরিমাণ গ্যাসে কর্মস্থলে পৌঁছানো এবং পরবর্তী যাতায়াত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তিনি।

পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর ২১৭ টাকার গ্যাস

ইমরান নামের আরেক প্রাইভেট কারচালক জানান, তিনি দক্ষিণখান থেকে গ্যাস নেওয়ার জন্য উত্তরার দুটি পাম্পে যান। কোথাও পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ভোর ৬টার দিকে লাইনে দাঁড়ান।

দীর্ঘ যানজটের মতো সারি পেরিয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর তাঁর গাড়িতে ২১৭ টাকার গ্যাস দেওয়া হয়। তবে প্রয়োজনের তুলনায় কম গ্যাস পাওয়ায় হতাশা নিয়েই পাম্প ছাড়তে হয়েছে বলে জানান তিনি।

গ্যাসের সংকটের কারণে একই ধরনের ভোগান্তিতে পড়েছেন আরও অনেক চালক। তাঁদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।

লাইনে অনিয়মের অভিযোগ

গ্যাস সরবরাহ নিয়ে ভোগান্তির পাশাপাশি পাম্পে লাইনের শৃঙ্খলা নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন চালক।

মগবাজার থেকে উত্তরায় গ্যাস নিতে আসা কামরান নামের এক চালকের অভিযোগ, পাম্পের কিছু কর্মীকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে লাইনে না দাঁড়িয়েও কেউ কেউ গ্যাস নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

তাঁর দাবি, ১০০ থেকে ২০০ টাকা অতিরিক্ত দিলে অনেককে অপেক্ষমাণ দীর্ঘ সারি এড়িয়ে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। এতে দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকদের ভোগান্তি আরও বাড়ছে।

তবে অভিযোগের বিষয়ে পাম্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন।

‘সরবরাহ কম, চাপও পর্যাপ্ত নয়’

মেসার্স মাসুদ এন্টারপ্রাইজের পরিচালক জানান, দেশব্যাপী গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকায় তাঁদের পাম্পও স্বাভাবিক পরিমাণে গ্যাস পাচ্ছে না।

তিনি বলেন, যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, সেটিতেও পর্যাপ্ত চাপ নেই। ফলে দীর্ঘ সময় পাম্প চালু রাখার পরও যানবাহনে স্বাভাবিক হারে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

পাম্প কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সংকটের কারণে একদিকে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে, অন্যদিকে চাপ কম থাকায় একই সময়ে স্বাভাবিক সংখ্যক গাড়িতে গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। এ কারণেই পাম্পের সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।

সামিটের এফএসআরইউ থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু

এদিকে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আশা তৈরি হয়েছে। সামিট এলএনজি টার্মিনাল শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানান, সামিটের এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে গ্যাসের চাপ বাড়বে এবং মধ্যরাতের মধ্যে সরবরাহ পূর্ণমাত্রায় পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, একই সঙ্গে এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ থেকেও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। দুই টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়ানো গেলে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হবে বলে আশা করছে পেট্রোবাংলা।

অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই গ্যাস সংকট

গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

এর প্রভাব পড়ে দেশের বিভিন্ন খাতে। বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়ে যায়।

একই সংকটের প্রভাব পড়ে সিএনজি পরিবহন খাতেও। রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে সিএনজি নিতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। কোথাও কয়েক ঘণ্টা, আবার কোথাও রাতভর অপেক্ষা করেও চালকেরা প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না।

সরবরাহ বাড়লেও স্বস্তি ফিরতে সময় লাগতে পারে

সামিটের এফএসআরইউ থেকে সরবরাহ পুনরায় শুরু হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের পরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকেও সরবরাহ অব্যাহত থাকলে সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

তবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে স্বাভাবিক চাপ ও পর্যাপ্ত সরবরাহ ফিরতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। এর আগে পর্যন্ত রাজধানীর সিএনজি পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি ও চালকদের ভোগান্তি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

চালকদের প্রত্যাশা, দ্রুত গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ স্বাভাবিক করা হবে এবং পাম্পগুলোতে সুশৃঙ্খলভাবে গ্যাস বিতরণ নিশ্চিত করা হবে। এতে দীর্ঘ সময় রাস্তায় অপেক্ষা, কর্মঘণ্টার অপচয় এবং গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচলের অনিশ্চয়তা কিছুটা কমবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন