শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

তিন বছর পর অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আশরাফুল নিখোঁজের রহস্য উদঘাটন, মূল আসামি গ্রেপ্তার

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে তিন বছর আগে নিখোঁজ হওয়া অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মো. আশরাফুল ইসলামকে অপহরণের পর হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ঘটনায় মামলার এজাহারনামীয় আসামি মো. রফিকুল ইসলামকে (৫৪) গ্রেপ্তার করেছে সিআইডির সিরাজগঞ্জ জেলা ইউনিট।

গত ১২ আগস্ট ২০২৬ তারিখ দুপুরে শাহজাদপুর থানাধীন জামিরতা বাজার এলাকা থেকে রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার গাড়াদহ এলাকার মৃত নুর হোসেন মোল্লার ছেলে এবং বর্তমানে জামিরতা এলাকায় বসবাস করেন।

সিআইডি সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট সন্ধ্যার পর রফিকুল মোবাইল ফোনে একাধিকবার আশরাফুলকে কল করে বাড়ি থেকে ডেকে জামিরতা বাজারে নিয়ে যান। এরপর আশরাফুল আর বাড়ি ফেরেনি। রাতে পরিবারের সদস্যরা তার অপেক্ষায় থাকলেও ফিরে না আসায় বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরদিন আশরাফুলের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

আত্মীয়-স্বজনসহ সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও আশরাফুলের সন্ধান না পাওয়ায় তার বাবা শাহজাদপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে দীর্ঘদিনেও কোনো সন্ধান না পাওয়ায় আশরাফুলের মা মোছা. নাছিমা খাতুন ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর তিনজনকে আসামি করে আদালতে পিটিশন মামলা নম্বর ২৮৮/২০২৩ দায়ের করেন। পরবর্তীতে আদালত মামলাটির তদন্তভার সিআইডি সিরাজগঞ্জের ওপর ন্যস্ত করেন।

সিআইডি জানায়, মামলাটি প্রথমদিকে কোনো সুস্পষ্ট সূত্রবিহীন শিশু অপহরণ মামলা হিসেবে তদন্তাধীন ছিল। দীর্ঘদিন তদন্ত করেও আশরাফুলের অবস্থান কিংবা তার সঙ্গে কী ঘটেছিল সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে মামলার তদন্তভার এসআই (নিরস্ত্র) মো. আজমল হোসেনের ওপর অর্পণ করা হলে তদন্তে নতুন করে গতি আসে।

সিআইডি সিরাজগঞ্জের বিশেষ পুলিশ সুপার মোনালিসা বেগম, পিপিএম-এর নির্দেশনায় তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার আরজি পুনঃবিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ এবং স্থানীয়ভাবে গোপন ও প্রকাশ্য তদন্ত শুরু করেন। একপর্যায়ে বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে যোগসূত্র পাওয়া গেলে মামলার এজাহারনামীয় ১ নম্বর আসামি রফিকুল ইসলামের ভূমিকা তদন্তকারীদের নজরে আসে।

মামলাটি স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর হওয়ায় অধিকতর তদন্তের স্বার্থে তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে পিটিশন মামলা থেকে নিয়মিত এফআইআর হিসেবে শাহজাদপুর থানায় মামলা রুজুর আবেদন করেন। আদালতের আদেশে মামলাটি নিয়মিত এফআইআর হিসেবে রুজু হওয়ার পর তদন্ত আরও জোরদার করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ১২ আগস্ট দুপুর সাড়ে ১টার দিকে জামিরতা বাজার এলাকা থেকে রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিআইডির দাবি, গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে আশরাফুল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

সিআইডি সূত্রে আরও জানা যায়, জিজ্ঞাসাবাদে রফিকুল আশরাফুলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা জানান। একপর্যায়ে আশরাফুল অন্য দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে একজন যৌনকর্মীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে—এমন তথ্য জানতে পেরে রফিকুল ক্ষুব্ধ হন। এই ক্ষোভ থেকেই তিনি আশরাফুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন রফিকুল মোবাইল ফোনে আশরাফুলকে ডেকে যমুনা নদীর পাড়ে নিয়ে যান। সেখানে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট দেওয়ার কথা বলে কৌশলে তাকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়। ওষুধের প্রভাবে আশরাফুল অচেতন হয়ে পড়লে তাকে যমুনা নদীর পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে নদীর স্রোতে তার মরদেহ ভেসে যায় বলে রফিকুল জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।

পরবর্তীতে রফিকুল স্বেচ্ছায় আদালতে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

সিআইডি জানায়, রফিকুলের বিরুদ্ধে এর আগেও গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ও মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রায় ৭-৮ বছর আগে উল্লাপাড়া থানা এলাকায় মন্টু মিয়ার বাড়িতে তাঁতের কাজে সহযোগিতা করার সময় তার ছেলে শাহিনের সঙ্গে রফিকুলের অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয় বলে তদন্তে জানা যায়। পরে শাহিনের বিয়ের বিষয় জানতে পেরে রফিকুল ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুরুতর জখম করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় মন্টু মিয়া বাদী হয়ে ২০১৫ সালের ২৩ জুন শাহজাদপুর থানায় মামলা নম্বর ২৫, ধারা ৩২৬/৩০৭ পেনাল কোডে মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ রফিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরবর্তী সময়ে বিচারিক কার্যক্রম শেষে তিনি সাত বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে সাজা ভোগ করেন।

তবে আশরাফুলকে অপহরণের আড়ালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করা হলেও এখনো তার মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। রফিকুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবং সম্ভাব্য অন্যান্য উৎস থেকে মরদেহের সন্ধানে অভিযান ও অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

সিআইডি জানিয়েছে, যমুনা নদীর ভাটি অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে অজ্ঞাতনামা মরদেহ সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর রেজিস্টার ও নথিপত্র সরেজমিনে যাচাই করা হচ্ছে।

আশরাফুলের মরদেহ উদ্ধার, রফিকুলের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত কি না—তা উদঘাটনে সিআইডির তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন