শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

অনলাইন জুয়া চক্রের বিরুদ্ধে সিআইডির অভিযান, গ্রেপ্তার ৫

নরসিংদীতে অভিযানে ৯ মোবাইল, ২০ সিম ও ব্যাংকের চেকবই জব্দ

অনলাইন বেটিং ও জুয়ার মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগে নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস ইউনিটের একটি বিশেষ দল গত ১১ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—রায়পুরার শ্রীরামপুর এলাকার রফিকুল ইসলাম (৪৬), মনোহরদীর নোয়াদীয়া এলাকার মো. সোহেল (৩৭), একই উপজেলার রসুলপুর এলাকার মো. শফিকুল ইসলাম (২৭), উত্তর নোয়াদীয়া এলাকার মো. রুবেল মোল্ল্যা (৩৩) এবং নরসিংদী সদরের নয়াদরাকান্দিয়া এলাকার আইয়ুব হোসেন রিপন (৪৮)।

সিআইডি জানায়, রায়পুরা থানার রেলগেট কলেজ মার্কেট এলাকা থেকে রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। মনোহরদীর নোয়াদীয়া গ্রামের মৌলভী বাড়ি এলাকা থেকে সোহেল, থানার সামনে রাজু টাওয়ার এলাকা থেকে শফিকুল ইসলাম ও রুবেল মোল্ল্যা এবং নয়াদরাকান্দিয়া এলাকা থেকে আইয়ুব হোসেন রিপনকে আটক করা হয়।

অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে অনলাইন জুয়া পরিচালনায় ব্যবহৃত নয়টি মোবাইল ফোন, ২০টি সিম কার্ড, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবইসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করা হয়েছে।

যেভাবে পরিচালিত হচ্ছিল বেটিং কার্যক্রম

সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, দেশের ভেতরে ও বিদেশে অবস্থানকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন নামে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনা করে আসছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন ক্রীড়া ইভেন্টকে কেন্দ্র করে এসব প্ল্যাটফর্মে অর্থের বিনিময়ে বেটিংয়ের ব্যবস্থা করা হতো। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব সাইটের প্রচারণাও চালানো হতো।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, এসব ওয়েবসাইটে জুয়ায় অংশ নিতে ব্যবহারকারীদের প্রথমে অর্থ জমা বা ‘টপ-আপ’ করতে হতো। অর্থ জমার ক্ষেত্রে বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়সহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ব্যাংক হিসাব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছিল বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

অর্থ জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বেটিং অ্যাকাউন্টে ভার্চুয়াল অর্থ যুক্ত করা হতো। পরে সেই অর্থ ব্যবহার করে বিভিন্ন খেলায় বেটিং করা সম্ভব হতো।

এজেন্টদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন

সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করে তাদের কাছ থেকে এমএফএস নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করত। পরে যোগাযোগের বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম, বিশেষ করে টেলিগ্রাম ব্যবহার করে এসব হিসাব ও নম্বর বেটিং সাইট পরিচালনাকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।

এসব হিসাব ও নম্বর ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বেটিংয়ের অর্থ সংগ্রহ ও পরিশোধ করা হতো। প্রাথমিক তদন্তে আরও তথ্য পাওয়া গেছে যে, এজেন্টরা বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত অর্থ একত্র করে কমিশন রেখে অবশিষ্ট অর্থ অন্য ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরের মাধ্যমে বিদেশে পাঠাত।

মামলায় সাইবার আইনের ধারায় অভিযোগ

এ ঘটনায় সিআইডির পক্ষ থেকে পল্টন মডেল থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলাটি ১৯ মে ২০২৬ তারিখে ২৪ নম্বরে রুজু করা হয়। এতে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০(২), ২১(২), ২৪(২) ও ২৭(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অনলাইন বেটিং ও জুয়া পরিচালনাকারী চক্রের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। জব্দ করা মোবাইল ফোন, সিম, ব্যাংক হিসাব ও চেকবইয়ের ফরেনসিক এবং কারিগরি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

এর মাধ্যমে চক্রটির অন্যান্য সদস্য, অর্থ লেনদেনের ধরন এবং অর্থের সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য বের করার চেষ্টা চলছে।

দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে সিআইডি

সিআইডির সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস ইউনিট মামলাটির তদন্ত করছে। অনলাইন বেটিংয়ের সঙ্গে বিদেশে অবস্থানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং অবৈধভাবে লেনদেন করা অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে কি না—সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।

পাশাপাশি বেটিং সাইটের মূল পরিচালনাকারী, এজেন্ট, অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত এমএফএস ও ব্যাংক হিসাবের মালিক এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সিআইডি জানিয়েছে, অনলাইন জুয়া বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন কৌশলে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে।

সিআইডি সাধারণ মানুষকে অনলাইন বেটিং ও জুয়া থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে এ ধরনের কার্যক্রমে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন না করা এবং অনলাইন জুয়া বা বেটিং সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন