শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

কেরানীগঞ্জ থেকে সাভার: ধারাবাহিক বিস্ফোরক উদ্ধারে নাশকতার আশঙ্কা


ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে সাভার—রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক বিস্ফোরণ, বোমা উদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় একই উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সাম্প্রতিক ১১টি ঘটনায় একটি সংগঠিত নাশকতার পরিকল্পনার যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)।

সর্বশেষ সাভারের আশুলিয়া ও সাধাপুর এলাকায় বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে সাভারের হেমায়েতপুরে একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের পাশাপাশি একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হেমায়েতপুরে গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফের কাছ থেকে পাঁচটি পাইপসদৃশ বোমা, ছুরির আকৃতির তিনটি বোমা এবং বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া যায়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি তিনতলা বাড়ির একটি ভাড়া করা কক্ষে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ছয়টি বোমা এবং রাসায়নিক পদার্থ, বারুদ, গানপাউডার, বৈদ্যুতিক তার, বিয়ারিং বল, নাইট্রিক অ্যাসিড ও প্লাস্টিকের কনটেইনারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, ওই ঘটনায় সাভার থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। মামলায় আরিফসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, আসামিদের কয়েকজন নিষিদ্ধ ঘোষিত নব্য জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে সাভার এলাকায় সংগঠিত হয়েছিল।

কেরানীগঞ্জ থেকে শুরু তদন্তের সূত্র

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আল কুরা মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের পর উদ্ধার হওয়া একটি মুঠোফোন থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। ওই তথ্যের ভিত্তিতে চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি যশোরের বাঘারপাড়ায় অভিযান চালিয়ে ১০টি গ্রেনেড, তিনটি বিদেশি পিস্তল, গুলি, চাপাতি, ছুরি ও ক্ষুর উদ্ধার করা হয়।

পরবর্তী সময়ে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত কয়েকটি বিস্ফোরণ ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় একই নেটওয়ার্কের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য সামনে আসে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে পুলিশের ওপর হামলা, কুমিল্লায় একটি মন্দিরে বোমা হামলা, ফেনীতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা, যাত্রাবাড়ীতে তল্লাশির সময় পাইপবোমা বিস্ফোরণ, উত্তরার দক্ষিণখানে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের ওপর বোমা হামলা এবং মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতর থেকে বোমা উদ্ধার।

এ ছাড়া আশুলিয়ার একটি মুদিদোকান থেকে প্রেশার কুকারসদৃশ বোমা উদ্ধারের ঘটনাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

মেট্রোরেল ও সাভারে নিরাপত্তা জোরদার

সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনে সন্দেহজনক দুটি ব্যাগ পাওয়ায় আতঙ্ক ছড়ালেও পরে সেগুলোতে কোনো বিস্ফোরক বা ক্ষতিকর বস্তু পাওয়া যায়নি। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় নাশকতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সিটিটিসি ও এটিইউ কর্মকর্তাদের মতে, বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা সম্পর্কে তাঁরা তথ্য পেয়েছেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরক বা বোমা রাখার ঘটনা ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিটিটিসির একজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদে আশুলিয়ার একটি মুদিদোকানে প্রেশার কুকার বোমাসহ একটি ব্যাগ রেখে আসার তথ্য পাওয়া গেছে।

সিটিটিসির প্রধান ও পুলিশের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে এবং পুলিশি নজরদারি ও গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

গ্রেপ্তার আরিফের অতীত

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফের বিরুদ্ধে এর আগেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা ছিল। ২০২৩ সালে গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। তাঁর গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায়। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক নাশকতার ঘটনাগুলোর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

কয়েকজনের নাম বারবার সামনে আসছে

সিটিটিসির সূত্র বলছে, কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার শেখ আল আমিন ও অলি উল্লাহ জনির পাশাপাশি সাভারের ঘটনায় গ্রেপ্তার আরিফ এবং পলাতক কয়েকজনের নাম সাম্প্রতিক একাধিক তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্তকারীরা বলছেন, এসব ব্যক্তির অতীত কর্মকাণ্ড, কারাগার থেকে মুক্তির পর তাঁদের গতিবিধি এবং পারস্পরিক যোগাযোগের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণের ঘটনায় এ পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ঢাকা জেলা পুলিশ। তাঁদের মধ্যে শেখ আল আমিন ও তাঁর স্ত্রী আছিয়া বেগমও রয়েছেন। তদন্তে তাঁদের অতীত উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের মামলার তথ্যও সামনে এসেছে।

সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

ধারাবাহিক বিস্ফোরক উদ্ধার ও নাশকতার অভিযোগের পর রাজধানী ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, গণপরিবহন এবং জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তদন্তকারীরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা নাকি একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের অংশ—এটি নিশ্চিত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরক, জব্দ করা সরঞ্জাম, ডিজিটাল তথ্য এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে সন্দেহজনক কোনো ব্যাগ, প্যাকেট, ড্রাম বা বস্তু দেখতে পেলে তা স্পর্শ না করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন