মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা, বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

ব্রেন্টের দাম ৮৮ ডলারের কাছাকাছি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তায় বাড়ছে বাজারের উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার উদ্যোগে অচলাবস্থা দেখা দেওয়ায় বিশ্ববাজারে আবারও বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৮ ডলারে উঠে যায়। এর আগের দিনও আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছিল। 

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দিনের লেনদেন শেষে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্স ৪ দশমিক ১৭ ডলার বা ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৭ দশমিক ৭২ ডলারে স্থির হয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ৩ দশমিক ৯৫ ডলার বা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৮২ দশমিক ১৩ ডলারে ওঠে। 

মঙ্গলবারও তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ব্রেন্ট একপর্যায়ে ৮৮ ডলার এবং মার্কিন অপরিশোধিত তেল ৮২ দশমিক ৪৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে। 

হরমুজ নিয়ে আলোচনা থমকে গেছে

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা হয়। ফলে এ জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দেখা দেয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ইরান জানিয়েছিল, প্রণালিটি দিয়ে ট্রানজিটের বিষয়ে ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে তেহরান একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সামরিক হুমকি বন্ধের মতো অতিরিক্ত শর্ত সামনে এনেছে। 

এর ফলে দ্রুত হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বাজারের আশাবাদ কমে গেছে।

ট্রাম্পের ক্ষতিপূরণ দাবিতেও বাড়ছে অনিশ্চয়তা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি তোলার পর দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি সমঝোতা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্প বলেছেন, ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে যেকোনো আলোচনায় ক্ষতিপূরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ তিনি দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানও সংঘাতের কারণে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি তুলছে।

এ ধরনের পাল্টাপাল্টি দাবি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে দ্রুত সমঝোতার সম্ভাবনাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তেলের বাজারে। 

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?

পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের মধ্যে সংযোগকারী হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি ব্যবস্থার একটি বড় অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল।

ফলে এখানে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। বাজারে প্রকৃত সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেওয়ার আগেই ভবিষ্যৎ সংকটের আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা তেলের ফিউচার কিনতে শুরু করেন—যার ফলে দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতেও মূল উদ্বেগ সরবরাহের চেয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা। 

জ্বালানি থেকে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু পেট্রোল ও ডিজেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, কৃষি ও পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়তে পারে।

বিশেষ করে দীর্ঘদিন তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকলে বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে স্পষ্ট অগ্রগতি না হলে তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে। রয়টার্সের বাজার বিশ্লেষণে তেলের দাম নিয়ে ৭৫ থেকে ৯৫ ডলারের মধ্যে অস্থিরতার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। 

বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানির মাধ্যমে সংগ্রহ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে পরিবহন ও শিল্প খাতের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি আমদানি ব্যালান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি দেশের খুচরা জ্বালানি দামে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে আমদানি ব্যয়, সরকারি মূল্যনীতি, মজুত পরিস্থিতি এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামের গতিপথের ওপর।

সামনে নজর হরমুজে

বর্তমানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় অগ্রগতি হলে তেলের দাম দ্রুত কমে আসতে পারে। বিপরীতে সমঝোতা আরও পিছিয়ে গেলে কিংবা হরমুজে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়বে এবং তেলের দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। 


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন